ইয়াবা-আইস পাচার ঠেকাতে কক্সবাজার ও বান্দরবানে ১১ স্থানে স্থায়ী চেকপোস্টের প্রস্তাব
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম
চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান:
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন (আইস)। সীমান্তে নজরদারি এড়াতে পাচারকারীরা বারবার রুট পরিবর্তন করায় মাদক প্রবেশ ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে কক্সবাজার ও বান্দরবানের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থায়ী নিরাপত্তা চেকপোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবে এসব চেকপোস্টে ভেহিক্যাল স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুরের দল (ডগ স্কোয়াড) মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তিন পালায় ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের জন্য ৩২১ জন পুলিশ সদস্য চাওয়া হয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরে পুলিশ সদর দপ্তরে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে চোরাকারবারি ও মাদক কারবারিরা ইয়াবা ও আইস পাচার করছে। এসব চালান প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় জনবল, আবাসন, স্ক্যানার, ডগ স্কোয়াড ও নজরদারি সরঞ্জামসহ স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন জরুরি।
ছয় ভেহিক্যাল স্ক্যানারে ব্যয় ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১টি চেকপোস্টে নজরদারি জোরদার করতে ছয়টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটির আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এসব স্ক্যানারের মাধ্যমে বাস, কাভার্ড ভ্যান, পণ্যবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতরে লুকিয়ে রাখা সন্দেহজনক বস্তু শনাক্তের পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ তল্লাশিতে যানবাহনের গোপন স্থান কিংবা যন্ত্রাংশের ভেতরে লুকানো মাদক শনাক্ত করা কঠিন। স্ক্যানারের ছবিতে সন্দেহজনক স্থান চিহ্নিত করে পরে সরাসরি তল্লাশি চালানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
এ ছাড়া যাত্রীদের ব্যাগ ও মালপত্র পরীক্ষার জন্য আটটি লাগেজ স্ক্যানার কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটির আনুমানিক মূল্য ৪৫ লাখ টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কক্সবাজার ও নাইক্ষ্যংছড়ির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে এসব স্ক্যানার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবে কক্সবাজার রেলস্টেশনে রেলওয়ের নিজস্ব একটি লাগেজ স্ক্যানার থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ক্যানারে পাওয়া ছবি তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ৬৫ ইঞ্চির ২৩টি টেলিভিশন বা মনিটরিং স্ক্রিন এবং স্ক্যানিংয়ের ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণে ১১টি ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার (ডিভিআর) রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা
প্রস্তাবে ৩১টি এআই প্রযুক্তির ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা ও ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এআই ক্যামেরার সঙ্গে অপরাধী ও চিহ্নিত মাদক কারবারিদের তথ্যভান্ডার যুক্ত করতে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা চেকপোস্টের আওতায় এলে তাঁদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাশাপাশি মাদক ও রাসায়নিক পদার্থের গন্ধ শনাক্ত করতে আটটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আটটি বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুরের দল মোতায়েনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কক্সবাজারের আট ও বান্দরবানের তিন পয়েন্ট
পুলিশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা বিকল্প পথ খুঁজছে। টেকনাফ ও উখিয়ার পাশাপাশি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়েও ইয়াবা প্রবেশের প্রবণতা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজার জেলার আটটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থানার তিনটি পয়েন্টে স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কক্সবাজারের প্রস্তাবিত আটটি পয়েন্ট হলো—রামুর রাংকুট বৌদ্ধমন্দিরসংলগ্ন পুরোনো সড়ক, পনের ছড়া ফরেস্ট অফিসের কাটির মাথা, মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তের ভাঙ্গার মোড়, সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী লোহার ব্রিজ, কক্সবাজার রেলস্টেশন, উখিয়ার কোর্ট বাজার সড়ক, চকরিয়ার হারবাং সড়ক এবং রামুর গর্জনিয়া ডাকবাংলো মোড়।
প্রস্তাবে রাংকুট বৌদ্ধমন্দিরসংলগ্ন পুরোনো সড়ককে বান্দরবানের পাহাড়ি পথ দিয়ে আসা মাদকের চালান প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পনের ছড়া ফরেস্ট অফিসের কাটির মাথায় টেকনাফ ও উখিয়া থেকে পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে আসা চালান শনাক্তের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ভাঙ্গার মোড়ে সমুদ্রপথ ও পর্যটন এলাকার সঙ্গে যুক্ত সড়কে, চৌফলদণ্ডী লোহার ব্রিজ এলাকায় সামুদ্রিক ঘাট থেকে আসা সম্ভাব্য চালানে এবং কক্সবাজার রেলস্টেশনে যাত্রীদের ব্যাগ ও মালপত্রের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। উখিয়ার কোর্ট বাজার ও চকরিয়ার হারবাং পয়েন্টকে পাহাড়ি পথ থেকে মূল সড়কে মাদক পরিবহনের সম্ভাব্য সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বান্দরবানের প্রস্তাবিত তিনটি পয়েন্ট হলো—নাইক্ষ্যংছড়ি সদর প্রবেশমুখের বেইলি ব্রিজ, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের চৌরাস্তার মোড় এবং বাইশারীর পেটান আলী পাড়া। এসব পয়েন্টে সীমান্তসংলগ্ন সড়ক ও আঞ্চলিক যোগাযোগপথে চলাচলকারী যানবাহনে নজরদারি করা হবে।
২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে থাকবেন ৩২১ পুলিশ সদস্য
প্রস্তাবিত চেকপোস্টগুলো ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে আট ঘণ্টা করে তিন পালায় পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বড় ও ছোট চেকপোস্টের জন্য পৃথক জনবল কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে ভাঙ্গার মোড়ে ৪৫ জন এবং রেলস্টেশন, রাংকুট, কাটির মাথা, নাইক্ষ্যংছড়ির বেইলি ব্রিজ, সোনাইছড়ি ও বাইশারী পয়েন্টে ৩৩ জন করে পুলিশ সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে, চৌফলদণ্ডী, কোর্ট বাজার, হারবাং ও গর্জনিয়া পয়েন্টের প্রতিটিতে ১৬ জন করে সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম রেঞ্জের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সড়কপথে যাতে কোনোভাবেই ইয়াবা দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেভাবেই প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পুলিশের মাদকবিরোধী কার্যক্রমে গতি আসবে।
২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার
চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে মোট ১১ লাখ ২৪ হাজার ৬৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রেঞ্জের ১১ জেলায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৬৮ পিস এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম ২৪ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৬ হাজার ৮৩৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইয়াবা পাচারের রুটে ভেহিক্যাল স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার ও এআই ক্যামেরা বসানো হলে পুলিশের কাজ করতে সুবিধা হবে। এতে পাচারকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করাও সহজ হবে।
তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে ইয়াবা পাচার ও ব্যবহার রোধ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
পুলিশের প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সীমান্তসংলগ্ন জেলা দুটির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পাহাড়ি পথ, রেলস্টেশন ও সম্ভাব্য প্রবেশপথে নজরদারি আরও জোরদার হতে পারে। তবে প্রস্তাবটির অনুমোদন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং জনবল নিয়োগের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন।
আরও পড়ুন
গাইবান্ধায় একজন গুনী শিক্ষকের বিদায়: নিজেও কাঁদলেন-অন্যদেরকেও কাঁদালেন
কালীগঞ্জে ৭ নভেম্বর পালনের প্রস্তুতি সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
জাতীয় যুব পুরস্কারে দেশসেরা সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় নাটোরের রায়হান