চট্টগ্রামে দুই হাত হারিয়েও থামেনি রাব্বি, পা দিয়ে লিখে এসএসসি-এইচএসসিতে জিপিএ-৫
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম
চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান:
দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দুই হাত। কিন্তু হার মানেননি জীবনের কাছে। মুখ দিয়ে লিখে শুরু করেছিলেন পড়াশোনার লড়াই। পরে আয়ত্ত করেছেন পা দিয়ে লেখার কৌশল। সেই পা দিয়েই একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের অদম্য মেধাবী তরুণ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি। ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও পেয়েছেন জিপিএ-৫। তাঁর স্বপ্ন, একদিন বিজ্ঞানী হবেন। উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
রাব্বি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বজলুর রহমানের ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালে ভাটিয়ারীর হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে পা দিয়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষাতেও একই ফলাফল করেছিলেন।
রাব্বির জীবনের গল্প কেবল ভালো ফলাফলের নয়, বরং অসীম মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী ফুটওভার ব্রিজে ভয়াবহ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের শিকার হন রাব্বি। বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে তাঁর শরীর ঝলসে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে যান তিনি। স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক মাস চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি তাঁর দুই হাত। শেষ পর্যন্ত দুটিই কেটে ফেলতে হয়।
এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো থেমে যাবে রাব্বির শিক্ষাজীবন। কিন্তু সবার সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। প্রথমে মুখ দিয়ে লিখে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এভাবেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এগিয়ে নেন শিক্ষাজীবন। পরে লেখার গতি ও দক্ষতা বাড়াতে পা দিয়ে লেখার কৌশল আয়ত্ত করেন। এরপর থেকে পায়ের আঙুলের সাহায্যেই নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তিনি।
রাব্বি জানান, দুর্ঘটনার পর মা-বাবা, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। স্থানীয় সাংবাদিকেরাও শুরু থেকে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। গণমাধ্যমে তাঁর সংগ্রাম ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেয়েছেন। সবার উৎসাহ, সহযোগিতা এবং নিজের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই আজকের এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাব্বি জানান, বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি; বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাকে জয় করার মধ্য দিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চান।
রাব্বির বাবা বজলুর রহমান জানান, অভাব-অনটনের সংসারে তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে সংসার চালান। ছেলের দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ও পড়াশোনার ব্যয় বহন করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় রাব্বির চিকিৎসা ও শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। আইসিডিডিআরবির গবেষক ও চিকিৎসক ফেরদৌস কাদেরী তাঁর পড়াশোনার খরচ বহন করে আসছেন। ওসমান নামের এক শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে তাঁকে কোচিং করিয়েছেন। সবার সহযোগিতায় ছেলেকে সুস্থ করে বাঁচিয়ে রাখা এবং পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাব্বির বোন রোকাইয়া আক্তারও এবার রাউজার ভাটিয়ারী বিজয় সরণি কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘রাব্বির চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাস ছিল অসাধারণ। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও সে কখনো নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করেনি। বরং অন্যরা যা পারে, সেও তা পারবে—এমন বিশ্বাস নিয়েই এগিয়েছে। আজ সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে তার সাফল্যে। তার এই অর্জনে আমরাও গর্বিত।’
দুই হাত হারিয়েও যে স্বপ্ন হারাতে হয় না, প্রতিকূলতা জয় করে যে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যায়—রাব্বি যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের আনন্দ নয়, বরং হাজারো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা তরুণের জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার বার্তা।