ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য চাই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক ঐকমত্য

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কি বৈশ্বিক বাস্তবতার নতুন স্বাভাবিক রূপ?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে আজ একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন ক্রমেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। কোথাও নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, কোথাও সরকারবিরোধী আন্দোলন, কোথাও সাংবিধানিক সংকট, আবার কোথাও রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকার পরিবর্তিত হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব আসছে, নতুন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ানো হচ্ছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি ও সুশাসন অনেক ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যাচ্ছে।

এ সংকট কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের মতো দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যসম্পন্ন রাষ্ট্রও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক উত্তেজনা এবং নীতিগত অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কি একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন স্বাভাবিক রূপ হয়ে উঠছে? আর এই অস্থিরতার মূল্যই বা দিচ্ছে কে? বাস্তবতা হলো, এর মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, অর্থনীতিকে এবং সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বলতে কোনো সরকারের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকাকে বোঝায় না। বরং এর অর্থ এমন একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকে, আইনের শাসন অক্ষুণ্ন থাকে, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্বানুমানযোগ্যতা বজায় থাকে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা অটুট থাকে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তখনই গভীর সংকটে রূপ নেয়, যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, নীতিনির্ধারণকে অনিশ্চিত করে এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে ক্ষয় করতে থাকে।

বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর আলোচিত গ্রন্থ Political Order in Changing Societies-এ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দ্রুত বিস্তৃত হলেও সেই অনুপাতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অংশগ্রহণের বিকাশের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান বিশ্বের বহু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে হান্টিংটনের এই পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন এক বিষয় নয়। Government Change is not equal to System Change। অর্থাৎ ক্ষমতার পালাবদল হলেই রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হয় না। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ও আইনের শাসনে মৌলিক পরিবর্তন না এলে নতুন সরকারও পুরোনো সংকটের উত্তরাধিকার বহন করে। কখনো কখনো ক্ষমতার নতুন বিন্যাস পুরোনো দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিও ২০২০ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মুখোমুখি হয়েছিল। এর চরম প্রকাশ ঘটে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলার ঘটনায়। ঘটনাটি বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়; বরং নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বৈধ প্রতিযোগী হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতিই গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি। যখন প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং অবসরভাতা সংস্কারবিরোধী বিক্ষোভ দেখিয়েছে, জনগণের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ও সামাজিক সমঝোতা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংসদীয় অচলাবস্থা এবং একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার ওপর।

জার্মানিতে জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, অভিবাসন প্রশ্নে বিতর্ক এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইতালির ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্পেনে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দাবিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য যত সমৃদ্ধই হোক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে কোনো রাষ্ট্রই সংকটের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর Political Order and Political Decay গ্রন্থে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকারিতা হারালে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রশাসনিক অকার্যকারিতা ও শাসনসংকটে রূপ নিতে পারে। তখন সংঘাত আর সংসদ কিংবা রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতেও।

রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান মূল্য পরিশোধ করে অর্থনীতি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতিপরিবেশ, সম্পত্তির অধিকার, চুক্তির নিরাপত্তা এবং আইনের নির্ভরযোগ্য প্রয়োগ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ব্যবসায়ী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়েন, উদ্যোক্তারা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বিবেচনায় পিছিয়ে যান। এর পরিণতিতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন গবেষণাতেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এর সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে পণ্যের দাম বাড়ে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। একজন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ কিংবা সীমিত আয়ের পরিবারের কাছে রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি তাদের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের বাস্তব সংকট।

তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথম শর্ত হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাব ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে কার্যকর করা। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন এমন হতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব বিবেচনায় নয়; অপরাধ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে।

এ. ভি. ডাইসির The Law of the Constitution গ্রন্থে আলোচিত আইনের শাসনের ধারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতাও আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হতে হবে এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। আইন যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা নষ্ট হয়। আইনের শাসনের প্রকৃত শক্তি হলো—ক্ষমতাসীন ও বিরোধী, প্রভাবশালী ও সাধারণ নাগরিক, সবাই একই আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহির আওতায় থাকবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস এ. রবিনসন তাঁদের বিখ্যাত গ্রন্থ Why Nations Fail-এ দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ভালো ভিত্তি তৈরি করতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান এমন ব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ও সুযোগের ক্ষেত্রে ন্যায্য অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

কোনো জনগোষ্ঠী যদি মনে করে রাষ্ট্রে তাদের মতামতের মূল্য নেই, তাদের জন্য সমান সুযোগ নেই কিংবা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পথ বন্ধ, তাহলে অসন্তোষ বাড়বেই। তাই কার্যকর স্থানীয় সরকার, নাগরিক অংশগ্রহণ, সংখ্যালঘু মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, গণতন্ত্রকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলেও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সমঝোতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতিও প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরেন্ড লাইপহার্ট তাঁর Patterns of Democracy গ্রন্থে বহুমাত্রিক সমাজে ঐকমত্যভিত্তিক গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমাজে মত ও স্বার্থের বৈচিত্র্য থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংখ্যালঘু মতামতের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয়। বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলনের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের মাধ্যমে অতীতের সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে সত্য অনুসন্ধান, স্বীকৃতি ও পুনর্মিলনের প্রক্রিয়ায় আনার চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগ সব ক্ষত মুছে দিতে না পারলেও জাতীয় পুনর্মিলন ও রাজনৈতিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এর শিক্ষা হলো, সংলাপ দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দূরদর্শিতার প্রকাশ।

চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও গণতান্ত্রিক চর্চা থাকতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। দলের ভেতরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি অনুপস্থিত থাকলে জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

পঞ্চমত, ডিজিটাল যুগের তথ্যযুদ্ধ ও অপপ্রচার মোকাবিলা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অল্প সময়ে ব্যাপক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। জার্মান দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস তাঁর জনপরিসরবিষয়ক তত্ত্বে গণতান্ত্রিক সমাজে যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও মতবিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সেই বিবেচনায় তথ্যের সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এখন গণতন্ত্র রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।

সবশেষে প্রয়োজন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, জলবায়ু অভিযোজন, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোকে প্রতিদিনের দলীয় সংঘাতের বাইরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। সরকার পরিবর্তিত হলেও এসব মৌলিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হয় এবং নাগরিকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে বিরোধী মতের অনুপস্থিতি নয়; বরং মতবিরোধের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সচল রাখা, সাংবিধানিক নিয়ম মেনে চলা এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা পরিচালনা করা। গণতন্ত্রে বিরোধিতা থাকবে, আন্দোলন থাকবে, সরকারের সমালোচনা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের কোনোটিই যেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করে না ফেলে, সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো রাষ্ট্র কেবল শক্তিশালী নেতা কিংবা জনপ্রিয় সরকারের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না। স্থিতিশীলতার প্রকৃত ভিত্তি হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি।

অতএব, আজ বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা কার্যকর থাকবে, প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন থাকবে এবং নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাবে, সেটিই মুখ্য। ক্ষমতার পালাবদল সাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি গড়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।

রাজনীতির লক্ষ্য যদি জনকল্যাণ হয়, তবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত বিজয়ী কোনো দল বা ব্যক্তি নয়—হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও জনগণ। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com