শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা: উন্নয়নের আড়ালে উপেক্ষিত মানুষের জীবন
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখার পেছনে যাঁদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগ সবচেয়ে বেশি, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাঁদের জীবনমান ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিই যেন সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। পোশাকশিল্পের শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, কৃষিশ্রমিক কিংবা প্রবাসে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ—দেশের উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাঁদের অবদান অপরিসীম। অথচ তাঁদের বড় একটি অংশের জীবন কাটে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও অধিকারবঞ্চনার মধ্যে। প্রশ্ন হলো, যে শ্রমিকের শ্রমে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাঁর জীবন কেন আজও এত অরক্ষিত?
উন্নয়নের হিসাব, শ্রমিকের জীবনের হিসাব কোথায়?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, রপ্তানি ও যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সুফল শ্রমজীবী মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর সব ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রতিফলন ঘটে মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশে।
বাস্তবতা হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও সন্তানের শিক্ষার খরচ শ্রমিক পরিবারের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। আয় বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাসের শেষ দিকে ধারদেনা, পুষ্টিহীনতা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া বহু পরিবারের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণে শুধু উৎপাদন ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা কিংবা মালিকপক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করলে চলবে না। জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, মূল্যস্ফীতি এবং ন্যূনতম মানবিক চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া নয়; এটি তাঁর শ্রমের স্বীকৃতি এবং ন্যায্য অধিকার।
আইন আছে, বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশে শ্রম আইন, শ্রম আদালত, কলকারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থা ও শ্রমিক সংগঠনের কাঠামো রয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়ন আর আইন কার্যকর করার মধ্যে বড় পার্থক্য থেকে যায়। কোথাও কর্মপরিবেশ অনিরাপদ, কোথাও মজুরি পরিশোধে অনিয়ম, আবার কোথাও শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উত্থাপনের সুযোগ সীমিত।
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবনের নিরাপত্তাহীনতা কিংবা প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; অনেক ক্ষেত্রে এগুলো তদারকির দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিফলন। শ্রমিকের জীবনকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংগঠন করার অধিকার, যৌক্তিক দাবি উত্থাপন এবং নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিক: রেমিট্যান্সের নায়ক, নিরাপত্তায় অবহেলিত
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বজায় রাখা, পরিবারের ভরণপোষণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই অনেক শ্রমিক প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের দৌরাত্ম্য ও মানব পাচারের ঝুঁকিতে পড়েন।
জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো একজন শ্রমিক যখন প্রতারণার শিকার হন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নয়, পুরো পরিবার। বিদেশে কর্মস্থলের নিরাপত্তাহীনতা, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা আইনি সহায়তার অভাব তাঁদের সংকটকে আরও গভীর করে।
এ ক্ষেত্রে দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা, দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বিদেশে শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ এবং বিপদগ্রস্ত শ্রমিকের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। কোনো পরিবার যেন প্রিয়জনের সন্ধানে শুধু সংবাদমাধ্যমের খবর কিংবা লাশ ফেরত আসার অপেক্ষায় না থাকে।
শ্রমিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
শ্রমিকের নিরাপত্তা বলতে শুধু কর্মস্থলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িত খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা, বাসস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ। অসুস্থ হলে চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হারালে সহায়তা কিংবা কর্মহীন হলে ন্যূনতম সুরক্ষা—এসব ব্যবস্থা ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা কঠিন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি। কারণ দুর্নীতি ও অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাব শ্রমিকের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এখানে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠন—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে শিল্পের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমের মর্যাদাই হোক উন্নয়নের মাপকাঠি
রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে কৃষিকাজ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমের অবদান রয়েছে। শ্রমের ধরন আলাদা হতে পারে, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কেবল বড় প্রকল্প, রপ্তানি আয় কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং একজন শ্রমিক তাঁর আয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন কি না, কর্মস্থলে নিরাপদ আছেন কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না এবং তাঁর সন্তান একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের সুযোগ পাচ্ছে কি না—এসব দিয়েও উন্নয়নের প্রকৃত মান নির্ধারণ করতে হবে।
শ্রমিককে অবহেলা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা, জীবনের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটানো এখন সময়ের দাবি। কারণ শ্রমিকের ঘামেই অর্থনীতির ভিত্তি নির্মিত হয়। সেই শ্রমিকের জীবন যদি অনিরাপদ, অধিকারহীন ও অনিশ্চিত থাকে, তবে উন্নয়নের অর্জনও পূর্ণতা পায় না।
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ শ্রেণির দাবি নয়; এটি একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত।