জেলহত্যা দিবস: কারাগারের অন্ধকারে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতার চার প্রদীপ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩ নভেম্বর এক গভীর শোক, বেদনা ও কলঙ্কের দিন। জেলহত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়েও রক্ষা পাননি জাতির চার শ্রেষ্ঠ সন্তান—মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান। রাষ্ট্রের হেফাজতে, কারাগারের অভ্যন্তরে রাতের অন্ধকারে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় অস্তিত্বের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল আরও গভীর ও ভয়াবহ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ঠেলে দেওয়া হয় এক অন্ধকার রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারেও তাঁদের জীবন সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়নি। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় আরেকটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ।
প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় চার নেতাকে কেন হত্যা করা হয়েছিল? তাঁরা কি কেবল চারজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন? মোটেই নয়। তাঁরা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব সুসংহত করার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহস এবং আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা। স্বাধীনতার জন্য তাঁরা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেননি, নিজেদের জীবনকেও উৎসর্গ করেছিলেন।
অথচ স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় সেই রাষ্ট্রের কারাগারেই কেড়ে নেওয়া হলো তাঁদের জীবন। যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা সংগ্রাম করেছেন, যে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, সেই রাষ্ট্রেরই নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে তাঁদের হত্যা করা হলো। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?
জেলহত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি সংঘটিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার অভ্যন্তরে। কারাগারে বন্দীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেখানে বন্দী চারজন জাতীয় নেতাকে হত্যা করা প্রমাণ করে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে কতটা গভীর ষড়যন্ত্র ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল না; রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও ছিল এক চরম আঘাত।
হত্যাকাণ্ডের পর বিচারপ্রক্রিয়ার পথও মসৃণ ছিল না। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর এ ঘটনায় মামলা হলেও দীর্ঘ ২১ বছর কার্যত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া থমকে ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটির কার্যক্রম নতুন করে শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে দণ্ড ও খালাসের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। এ মামলার বিচারিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত আসামিদের কেউ কেউ অন্য মামলায় দণ্ড কার্যকরের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জাতীয় চার নেতার মতো ব্যক্তিত্বকে হত্যার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া এত দীর্ঘ ও জটিল হবে কেন? অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে দুই দশকের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে কেন? দণ্ডিত ব্যক্তিদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে না কেন? বিচার কেবল আদালতের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না; অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ এবং আইনের আওতায় বিচার নিশ্চিত করাও তার অপরিহার্য অংশ।
জেলহত্যা দিবস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কঠিন বাস্তবতাও সামনে নিয়ে আসে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি কীভাবে একটি জাতির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার অন্যতম নির্মম দৃষ্টান্ত ৩ নভেম্বর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। কিন্তু মতের অমিল যখন হত্যা, দমন-পীড়ন ও প্রতিহিংসার রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, বিপন্ন হয় গণতন্ত্র এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।
ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রকে কখনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারার পরিণতি ভয়াবহ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। ক্ষমতার পালাবদল হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের নিরাপত্তা কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না।
আজকের প্রজন্মের কাছে জাতীয় চার নেতার জীবন, অবদান ও আত্মত্যাগের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি। তাঁদের স্মরণ করা মানে কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া নয়; বরং তাঁদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় বিতর্কের সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ না রেখে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ধারণ করতে হবে। ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই একটি জাতি তার আত্মপরিচয়ে দৃঢ় হতে পারে।
জেলহত্যা দিবস তাই কেবল অতীতের শোক স্মরণের দিন নয়; এটি বর্তমানের জন্য সতর্কবার্তা এবং ভবিষ্যতের জন্য অঙ্গীকারের দিন। যে রাষ্ট্রে কারাগারের ভেতরেও বন্দীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, যে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে হয়, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কখনোই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না।
৫১ বছর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতার চার প্রদীপ। কিন্তু তাঁদের আদর্শ, অবদান ও আত্মত্যাগের ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়। সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের সত্য তার নিজস্ব শক্তিতেই বেঁচে থাকে।
আজ জেলহত্যা দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জাতীয় চার নেতাকে। তাঁদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কাউকে প্রাণ দিতে হবে না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কারও জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে সবার জন্য সমানভাবে। শোককে শক্তিতে, ইতিহাসকে শিক্ষায় এবং আত্মত্যাগকে রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণায় রূপান্তরিত করাই হোক জেলহত্যা দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।