কাজের আশায় প্রতিদিন সকাল থেকে অপেক্ষা করে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে

‘কামলার হাটে’ শ্রমিকের ভিড় বাড়ছে, মিলছে না কাজ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ পিএম

হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট:

ভোরের আলো ফোটার আগেই কোদাল, কাস্তে, দাঁ, টুকরি আর রশি হাতে রংপুর নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন দিনমজুরেরা। উদ্দেশ্য একটাই—দিনের জন্য নিজের শ্রম বিক্রি করা। কেউ মাটি কাটতে পারেন, কেউ ইট, বালু ও পাথর বহন করতে, আবার কেউ বাঁশের বেড়া তৈরি কিংবা অন্য যেকোনো দিনমজুরির কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু কাজের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অধিকাংশ দিনই তাদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। ঘরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের জন্য সামান্য আয়টুকুও জোগাড় করতে না পেরে হতাশা নিয়ে ফিরছেন তারা।

রংপুর নগরীর অন্তত ১২টি পয়েন্টে প্রতিদিন বসে এসব ‘কামলার হাট’। নগরীর গনেশপুর, শাপলা চত্বর, স্টেশন রোড, মডার্ন মোড়, সাতমাথা, মাহিগঞ্জ, দর্শনো, টার্মিনাল, নজিরহাট, তাজহাট, লালবাগ ও চিকলি এলাকায় ;কামলার হাটে’ গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকেরা নিজেদের শ্রম বিক্রির অপেক্ষায় থাকেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ এসব হাট থেকে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কিংবা চুক্তিতে কাজে নিয়ে যান। তবে গত এক মাস ধরে কাজের সংকট তীব্র হয়েছে। আগে সপ্তাহে অন্তত চার দিন কাজের সুযোগ মিললেও এখন অনেকের ভাগ্যে জুটছে মাত্র এক-দুই দিন। ফলে দিনমজুরদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা।

শ্রমিকেরা জানান, প্রতিটি হাটে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত দিনমজুর আসেন। তাদের অধিকাংশই গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামে কৃষিকাজ ও অন্যান্য দিনমজুরির কাজ কমে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে তারা শহরে আসছেন। কিন্তু শহরেও কাজের চাহিদা না থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে অপেক্ষমাণ শ্রমিকের সংখ্যা। সংসার চালাতে কেউ ঋণ করছেন, কেউ ধারদেনা করে দিন পার করছেন। আবার অনেক পরিবারকে খাবারের খরচ কমিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকতে হচ্ছে।

গণেশপুর ‘কামলার হাটে’ আসা শিবপুর গ্রামের দিনমজুর সাইদুল ইসলাম প্রতিদিন সকালে কাজের আশায় সেখানে হাজির হন। কিন্তু গত এক মাসে মাত্র পাঁচ দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। বাকি ২৫ দিনই তাকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “গ্রামে এখন তেমন কাজ নেই। তাই শহরে আসি শ্রম বিক্রি করতে। কিন্তু শহরেও কাজ মিলছে না। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে খুব কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। জীবনে কখনো কাজের এমন সংকট দেখিনি।”

একই হাটে কাজের অপেক্ষায় থাকেন গণেশপুর এলাকার চান মিয়া (৫২)। গত এক সপ্তাহে মাত্র দুই দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। প্রতিদিন মাটি কাটার কাজ করে মজুরি পেয়েছেন ৬০০ টাকা। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। নিয়মিত কাজ না থাকায় পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

চান মিয়া বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাটে বসে থাকি। কিন্তু কেউ শ্রমিক নিতে আসে না। কখনো কাজ পাই, কখনো খালি হাতে বাড়ি ফিরি। আয় না থাকলে সংসার চালাব কীভাবে? বাধ্য হয়ে কখনো চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। এই অবস্থা আর কত দিন চলবে জানি না।”

দেওডোবা গ্রাম থেকে শাপলা চত্বরে ‘কামলার হাটে’ আসেন আনোয়ারুল ইসলাম (৪৮)। মাটি কাটা, ইট-পাথর ও বালু বহন, বাঁশের কাজসহ বিভিন্ন ধরনের দিনমজুরির কাজ করতে পারেন তিনি। গ্রামে কাজ না থাকায় শহরে আসেন। কিন্তু এখানেও কাজের লোক নেওয়ার মতো মানুষের দেখা মিলছে না।

আনোয়ারুল বলেন, “কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। কাজের জন্য প্রস্তুত থাকি, কিন্তু কাজই নেই। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আগে কখনো এমন কর্মসংকট দেখিনি।”

মমিনপুর থেকে আসা জামবাবু বর্মণ জানান, গত এক মাস ধরে ‘কামলার হাটে’ কাজের সংকট চলছে। অথচ এর আগে সপ্তাহে অন্তত চার দিন কাজ পেতেন। দিনমজুরির বাইরে তাঁর অন্য কোনো পেশা নেই। ফলে কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, “এখন গ্রামেও কাজ নেই, শহরেও কাজ নেই। দিনমজুরি ছাড়া আর কিছু করতে পারি না। উপার্জন না থাকলে সংসার চালাব কীভাবে? তবে কয়েক দিনের মধ্যে গ্রামে কৃষিকাজ শুরু হলে হয়তো কিছুটা কাজ পাওয়া যাবে।”

গণেশপুর ‘কামলার হাটের’ শ্রমিক আমির হোসেন বলেন, হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসা অধিকাংশ মানুষই ভূমিহীন। কারও কারও বসতভিটা থাকলেও আবাদি জমি নেই। প্রতিদিনের উপার্জন দিয়েই তাঁদের পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। কিন্তু নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ একবেলা খেয়ে দিন পার করছেন।

আমির হোসেন বলেন, “আগের তুলনায় মাটি কাটার কাজ অনেক কমে গেছে। বাঁশের কাজও তেমন নেই। আমরা প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়েছি। প্রতিদিন কাজ পাব, এমন নিশ্চয়তাও নেই।”

মমিনপুর এলাকার কৃষক সাবিরুল ইসলাম জানান, খেতে আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। এরপর আলু, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজি চাষের মৌসুম শুরু হলে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়বে। তখন দিনমজুরেরা কাজের সুযোগ পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

গণেশপুর এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলী জানান, এলাকায় নির্মাণকাজও আগের মতো হচ্ছে না। আগে প্রায় সারা বছরই কোথাও না কোথাও বাড়িঘর নির্মাণের কাজ চলত। এসব কাজে মাটি, বালু, পাথর ও ইট বহনের জন্য দিনমজুরদের প্রয়োজন হতো। এখন নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় তাদের কাজের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “কাজের অভাবে কয়েকজন শ্রমিক আমার কাছ থেকে আগাম মজুরি নিয়ে গেছেন। তাদের হাতে টাকা নেই, সংসার চালানোর উপায়ও নেই। কাজ থাকলে তারা পরিশ্রম করে আয় করতে পারতেন।”

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com