৫২৯ পোশাক কারখানায় ছুটি, কাজে যোগ দেননি প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক: সংকট সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ এএম
একটি দেশের অর্থনীতির শক্তি শুধু তার রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা শিল্পকারখানার উৎপাদন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; সেই অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনমানের ওপরও। যে শ্রমিকের ঘামে তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে, সেই শ্রমিকের পরিবার যদি মাস শেষে খাবার, বাড়িভাড়া, সন্তানের শিক্ষাব্যয় ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খায়, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যানের আড়ালে জমে থাকা সংকটকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের ১ নভেম্বর দেশের বিভিন্ন পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ যে মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিছক একটি মজুরি-সংক্রান্ত বিরোধ নয়। এটি শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে এই অস্থিরতা দেশের রপ্তানি অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি সামনে রেখে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং কর্মবিরতির ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের দাবির যৌক্তিকতা বিচার করতে হলে তাঁদের আয় ও ব্যয়ের বাস্তব হিসাব সামনে আনতে হবে। বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস, যাতায়াত, চিকিৎসা এবং সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বাড়লে নির্দিষ্ট মজুরিতে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বাস্তবতায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি জীবনধারণের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। তবে ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে হলে শ্রমিকদের প্রয়োজন, শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর আলোচনায় পৌঁছাতে হবে। দাবি উপেক্ষা করে সংকট দীর্ঘায়িত করলে শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্র—কেউই শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে না।
৫২৯ কারখানায় ছুটি, উৎপাদনে বড় ধাক্কা
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে সংগঠনটির অধীন ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৮১৬টি চালু ছিল। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই দিনে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান বলে সংগঠনটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চিত্র নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শ্রমিকদের দৈনিক আয়, কারখানার উৎপাদন ব্যয়, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সরবরাহের সময়সীমা এবং দেশের রপ্তানি আয়ের প্রশ্ন। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার শ্রমিকের অসন্তোষের কারণগুলো সমাধান না করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করলেও স্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
সংঘাত নয়, প্রয়োজন সংলাপ
শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পদ ধ্বংসের কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মোকাবিলায় নির্বিচারে লাঠিপেটা, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড কিংবা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগও গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা—দুটি দায়িত্বই রাষ্ট্রের।
শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কোনো গোষ্ঠীর উসকানি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমিকা থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে দায়ী করে মূল সমস্যাকে আড়াল করা হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শ্রমিকদের অভিযোগ শোনা, তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই দায়িত্বশীল পথ।
১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে শ্রমিক অসন্তোষের কারণ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর। বৈঠক, বিবৃতি কিংবা সাময়িক ছুটি দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
কারখানা বন্ধের ঝুঁকি, শ্রমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪৫৭টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং এতে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি যাচাই ও কারণভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কারণ, কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে উৎপাদন ব্যয়, ক্রয়াদেশ, আর্থিক সংকট, ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক-মালিক বিরোধসহ একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।
কারখানা বন্ধ হলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে শ্রমিক পরিবারের ওপর। নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িভাড়া বকেয়া পড়ে, সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। ফলে কর্মসংস্থান রক্ষা, বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং শ্রমিকদের পুনর্বাসনের বিষয়গুলোকে শিল্পনীতি ও শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সমাধানের পথ কী?
প্রথমত, সরকার, বিজিএমইএ, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়ে জরুরি ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে মজুরি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সময়বদ্ধ রূপরেখা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত পর্যায়ে তা নির্ধারণের উদ্যোগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বকেয়া বেতন পরিশোধ, শ্রমিক ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ তদন্ত এবং শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রক্ষা করতে হবে। পঞ্চমত, যেসব কারখানা আর্থিক সংকটে রয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে শ্রমিকের পাওনা সুরক্ষিত রেখে পুনরুদ্ধার বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
পরিশেষে, পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ চান না; তাঁরা চান তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকের স্বার্থ ও শিল্পের সক্ষমতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে সাময়িকভাবে সড়ক শান্ত রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্পে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আবার সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, কার্যকর সংলাপ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সময়োপযোগী মজুরি নীতি। শ্রমিকের ঘামে যে অর্থনীতি সচল থাকে, সেই শ্রমিকের জীবনেই যদি নিরাপত্তা ও স্বস্তি না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্যও পূর্ণতা পায় না।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
আরও পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত
সোনারগাঁয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন মামলা নারী ও শিশু বলাৎকার সহ আটক ২২, ইয়াবা উদ্ধার
জীবন হত্যা মামলার প্রধান আসামি জুয়েলসহ গ্রেপ্তার ৩