ডিগ্রি বাড়ছে, কমছে মূল্যবোধ: অস্থিরতার নেপথ্যে কী?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
মোঃ মিলন শাহ, বিশেষ প্রতিনিধি, পত্নীতলা, নওগাঁ।
দেশে শিক্ষার হার ও জিপিএ ফাইভের গ্রাফ প্রতিবছরই ওপরের দিকে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষার এই দৃশ্যমান অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে সমাজে শান্তি বা স্থিতিশীলতা ফিরছে না; বরং দিন দিন জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ প্রবণতা।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে—কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, শিক্ষিত বেকারত্ব এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই 'জিপিএ সর্বস্ব' বা ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। জিপিএ ফাইভ পাওয়ার তীব্র লড়াইয়ে শিক্ষার্থীরা মানবিক গুণাবলি, সততা ও সহনশীলতার মতো মৌলিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় জায়গাতেই নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়াকে সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকরা।
শিক্ষার হার যে হারে বাড়ছে, সেই হারে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর উচ্চশিক্ষা শেষ করে লাখ লাখ তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছেন। দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট তরুণদের মনে চরম হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। এই হতাশা থেকেই অনেকে মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও নানামুখী অপরাধের অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছেন।প্রযুক্তির জোয়ারে গা ভাসিয়ে তরুণ প্রজন্মের একাংশ সাইবার অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার, অনলাইন জুয়া ও সহিংস কন্টেন্টের সহজলভ্যতা সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানছে। ফলে খুব সহজেই ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা ও সামাজিক সহিংসতার মতো অপরাধের বিস্তার ঘটছে।
আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ততার কারণে পরিবারগুলোতে সন্তানদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকছে না। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন এবং সঠিক অভিভাবকত্বের অভাবে শিশুরা একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগছে। পারিবারিক শাসনের অভাব ও নৈতিক দিকনির্দেশনার শূন্যতাই পরবর্তীতে তাদের বিপথগামী করছে।সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।শুধু অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক বা সনদধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি না করে, শিক্ষাকে 'জীবনমুখী ও নৈতিকতাভিত্তিক' করতে হবে।তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, মাদকের বিস্তার রোধ এবং আইনের কঠোর শাসন নিশ্চিত করতে পারলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা ও অস্থিরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।