ক্ষমতার পালাবদল, রাজনীতির কি আদৌ পরিবর্তন হলো?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের কারখানা নয়; এটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজ পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। অথচ আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনীতির সেই মৌলিক দর্শন ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। জনসেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করে কেউ কেউ কীভাবে সম্পদ, প্রভাব, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত আধিপত্যের মালিক হয়ে ওঠেন, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। রাজনীতি যেন অনেকের কাছে আদর্শের চেয়ে বিনিয়োগের, জনকল্যাণের চেয়ে মুনাফার এবং দায়িত্বের চেয়ে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার প্রায় এক শতাব্দী আগে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা *Politics as a Vocation*-এ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের থাকতে হবে আবেগ, দায়িত্ববোধ এবং বিচারবুদ্ধি। ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই আকর্ষণ যদি আত্মস্বার্থ ও আত্মপ্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক। ওয়েবারের দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—রাজনীতিতে উদ্দেশ্যের পবিত্রতার পাশাপাশি ফলাফলের দায়ও গ্রহণ করতে হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে এই তিনটি গুণের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, পেশিশক্তি, অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের বদলে কারও কারও ভাগ্য পরিবর্তনের গল্পই বেশি আলোচিত হচ্ছে। একসময় যাঁদের জীবনযাপন ছিল সাধারণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার সংস্পর্শে এসে তাঁদের কারও কারও বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তির সম্পদ নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সম্পদের উৎস কী এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা স্বচ্ছ?

উন্নত বিশ্বের রাজনীতিতেও দুর্নীতি নেই, এমন দাবি করা যাবে না। সেখানে করপোরেট লবিং, রাজনৈতিক অনুদান, স্বার্থের সংঘাত কিংবা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের মতো বিতর্ক রয়েছে। তবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন গণমাধ্যম, কার্যকর জবাবদিহি এবং আইনের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখে। বাংলাদেশের সংকট হলো, এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ, দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বারবার সামনে আসে। ফলে রাজনীতি ও অপরাধের মধ্যকার সীমারেখা কখনো কখনো অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা মিলেই সেই গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। আন্দোলনে ছাত্রছাত্রী, নারী, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবীসহ সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

ক্ষমতার পালাবদল মানেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নয়। পুরোনো ব্যবস্থার জায়গায় নতুন মুখ বসালেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। যদি নতুন রাজনৈতিক শক্তির একাংশও দখল, চাঁদাবাজি, প্রতিপক্ষকে হয়রানি, প্রতিষ্ঠান দখল কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের পুরোনো পথ অনুসরণ করে, তাহলে পরিবর্তনের মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। কোনো দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; তার বাস্তব প্রয়োগও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে। একাত্তর বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। কোনো দল যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তার সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় প্রতীক কিংবা স্বাধীনতার অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

একইভাবে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে তার দায় ধর্মের নয়, দায় সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের। ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণঅভ্যুত্থান—কোনোটিই রাজনৈতিক প্রতারণার ঢাল হতে পারে না। চব্বিশের আন্দোলনে জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিভিন্ন প্রতীক ধারণ করে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এক ছিল—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়াও ঠিক নয়। তবে আন্দোলনের পর জাতীয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে যে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান সামনে এসেছে, তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি।

গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ছিল এর ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সম্মিলিত শক্তির প্রতিনিধিত্ব কতটা বিস্তৃত থাকল, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পর রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিসরে তাঁদের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের দাবি রাখে। যে আন্দোলন সবার অংশগ্রহণে সফল হয়েছে, তার অর্জন কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক কর্তৃত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

রাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা আদায়ের প্রবণতা। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে; কিন্তু যখন সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকটে ভোগে, তখন জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সংযম ও জনস্বার্থের অগ্রাধিকার দেখাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, লোকদেখানো উন্নয়ন কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক, টেকসই ও জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ, শিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল পেশাদার রাজনীতিবিদ প্রয়োজন। কিন্তু রাজনীতি যখন সম্পদ আহরণের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন সেখানে সৎ ও যোগ্য মানুষের প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, নির্বাচনী ব্যয়ের জবাবদিহি, সম্পদের হিসাব প্রকাশ, দলীয় গণতন্ত্র এবং অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতিকে ব্যক্তিগত মুনাফার পথ থেকে সরিয়ে জনসেবার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।

মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের নাম নয়; গণতন্ত্র হলো ভিন্নমতকে সম্মান করা, বিরোধী পক্ষের অধিকার রক্ষা করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় রাখা। আজ যারা ক্ষমতার বাইরে, আগামীকাল তারাই ক্ষমতায় আসতে পারেন। তাই ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থানটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলকেন্দ্রিক হলে চলবে না; হতে হবে নীতিকেন্দ্রিক।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে ইতিহাসে অর্থবহ করে রাখতে হলে তার অর্জনকে রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, আইনের সমান প্রয়োগ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং জনগণের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদের সাফল্য কত সম্পদ অর্জন করলেন, কত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করলেন কিংবা কত দিন ক্ষমতায় থাকলেন—তা দিয়ে বিচার হওয়া উচিত নয়। বিচার হওয়া উচিত তিনি মানুষের জন্য কী করলেন, রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক করলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি রেখে গেলেন, তা দিয়ে।

কারণ ক্ষমতা সাময়িক, পদবিও সাময়িক; কিন্তু মানুষের কল্যাণে করা কাজই ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—রাজনীতি কি আবার জনসেবার জায়গায় ফিরবে, নাকি ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের পুরোনো প্রতিযোগিতাই নতুন নামে চলতে থাকবে?

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com