চট্টগ্রামে কালুরঘাট সেতুর দুই পাড়ে অবৈধ বালুর সাম্রাজ্য, নীরব রেল প্রশাসন

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম

চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান:

কর্ণফুলী নদীর ওপর শতবর্ষী কালুরঘাট সেতুর দুই পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ বালুর রমরমা বাণিজ্য। রেলের জমি ও সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্র। সেতুর পশ্চিম পাড়ে নগরীর অংশে রেলের জায়গা ছাড়িয়ে সড়কের ওপরও স্তূপ করে রাখা হয়েছে বালু। অন্যদিকে চার লেনের সড়কের অর্ধেকজুড়ে গড়ে উঠেছে বালুবাহী ডাম্পার ও ট্রাকের অবৈধ পার্কিং। এতে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, বাড়ছে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

অবৈধ বালু উত্তোলন ও বাণিজ্য বন্ধে উপজেলা প্রশাসন একাধিক অভিযান চালালেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য। ২৫ থেকে ৩০ টন ওজনের বালুবাহী ট্রাক চলাচল ঠেকাতে সড়কে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা (হাইট ব্যারিয়ার) স্থাপন করা হলেও গত ৩১ অক্টোবর তা ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। অবশ্য পরদিনই পুনরায় প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করা হয়।

বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, ‘বোয়ালখালীতে বৈধ কোনো বালুমহাল নেই। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

গত ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি দৈনিকে নগরীর কালুরঘাট থেকে সিঅ্যান্ডবি পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার এলাকার নানা অনিয়ম ও জনদুর্ভোগ নিয়ে ‘অভিভাবকহীন আড়াই কিলোমিটারে নরক যন্ত্রণা’ শিরোনামে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের একটি অংশে ‘রেলের জায়গা দখল করে বালু-বাণিজ্য, জেগে ঘুমাচ্ছে রেল’ শিরোনামে অবৈধ বালু ব্যবসার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।

তখন পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, কানুনগো পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। ফলে রেলের জমি দখল করে বালু ব্যবসা আগের মতোই চলছে।

 

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, কালুরঘাট খেজুরতল, ফেরিঘাট ও খালের তীর ঘেঁষে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে রেলের সুরক্ষার জন্য স্থাপন করা বিট থাকলেও প্রবেশমুখের বিট কেটে বালুবাহী ট্রাক চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছে। রেলের জায়গা দখলমুক্ত রাখার জন্য স্থাপিত সুরক্ষা ব্যবস্থা কেটে অবাধে বালু ব্যবসা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই।

এদিকে কালুরঘাট ও খেজুরতলা এলাকায় আরাকান সড়কের ওপর অন্তত শতাধিক মিনি ট্রাক পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে। এসব ট্রাকে করেই বিভিন্ন স্থানে বালু পরিবহন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা রেলের শত শত একর জমি দখল করে দীর্ঘদিন ধরে বালু ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই দখলদারত্ব টিকে রয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।

তাঁদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তন হলেও রেলের জমি অবৈধ দখলমুক্ত হয় না। বরং বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে কালুরঘাট সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশেও নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠেছে বালুর হাট। বলগেট ও মেশিনের সাহায্যে সরাসরি নদী থেকে বালু উত্তোলন করে এসব হাটে মজুত করা হচ্ছে। রেলের জমি ও সরকারি খাসজমি দখল করেও তৈরি করা হয়েছে একাধিক অবৈধ বালুর ব্যবসাকেন্দ্র।

জেলা প্রশাসনের বালুমহাল-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী অংশে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। অথচ উপজেলার কধুরখীল, চরণদ্বীপ ও শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি চলছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত তিন দশক ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের একটি অংশ বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এই অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির কিছু নেতার বিরুদ্ধেও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনও তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ নিয়ে প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিভিন্নভাবে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না বলে তাঁদের দাবি।

গত ১৮ অক্টোবর স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্দেশনায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুটি সড়কে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের পর ভারী ট্রাক চলাচল কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও কালুরঘাট এলাকা থেকেই ২৫ থেকে ৩০ টন ওজনের ট্রাকে বালু বোঝাই করা হচ্ছে। এসব বালু চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, বৈধ বালুমহাল না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বছরের পর বছর নদী থেকে বালু উত্তোলন, সরকারি জমি দখল এবং সড়ক অবরোধ করে ব্যবসা চলছে? প্রশাসনের অভিযান ও প্রতিবন্ধকতা স্থাপনেও যদি এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ না হয়, তাহলে কালুরঘাটের দুই পাড়ের দখলদারত্ব ও জনদুর্ভোগের অবসান ঘটবে কবে?

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com