নওগাঁয় যমজ সন্তানের কথা বলে সিজার, জন্মের পর এক নবজাতকের খোঁজ নেই
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম
মোঃ রমজান হোসেন নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ
দুই সন্তানের স্বপ্ন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক দম্পতি। গর্ভে যমজ সন্তান রয়েছে—এমন তথ্য দেওয়া হয়েছিল দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে। কিন্তু সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় মাত্র একটি নবজাতক। অপর সন্তানটির কোনো খোঁজ না পাওয়ার অভিযোগে নওগাঁর বলাকা ক্লিনিক ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে নওগাঁ শহরের বেসরকারি বলাকা ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, বাগ্বিতণ্ডা ও সমঝোতার চেষ্টা চলে। খবর পেয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এ ঘটনায় নবজাতকের সন্ধান ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে নওগাঁ সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন প্রসূতির স্বামী শান্ত ইসলাম। তিনি বদলগাছী উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রী শান্তনা আক্তার।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ১২ অক্টোবর জয়পুরহাটের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এবং ২১ অক্টোবর নওগাঁ শহরের রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। উভয় প্রতিবেদনে গর্ভে দুটি জীবিত ভ্রূণ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি চিকিৎসকের কাছ থেকেও তাঁরা যমজ সন্তান জন্মের কথা জানতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেন।
শান্ত ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, যমজ সন্তান হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুন সিজারের পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শেই বৃহস্পতিবার স্ত্রীকে বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরে ওই চিকিৎসকের অধীনে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তবে অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশু পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও দ্বিতীয় সন্তানের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
শান্ত ইসলাম বলেন, দুটি পৃথক আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে যমজ সন্তানের কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকও আমাদের যমজ সন্তান হবে বলে জানিয়েছিলেন। এমনকি সন্তান জন্মের আনন্দে মিষ্টি খাওয়ার জন্য ৫০০ টাকা চেয়েছিলেন। অথচ সিজারের পর একটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। অন্য সন্তান কোথায় গেল, তা জানতে চাইলে সন্তোষজনক উত্তর পাইনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাঁকে আর্থিক প্রস্তাব দিয়ে ঘটনা মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি কোনো সমঝোতায় না গিয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর দাবি, অপর নবজাতকের সন্ধান বের করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রসূতি শান্তনা আক্তারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে তাঁদের জানানো হয়েছিল গর্ভে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে শুধু একটি কন্যাশিশু দেখানো হয়। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা প্রতিবাদ করলে তাঁর পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সেলাই না করে ফেলে রাখা হয়।
শান্তনা বলেন, স্বজনরা প্রতিবাদ শুরু করলে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয় এবং কথা না শুনলে ওই অবস্থায় রেখে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে শারীরিকভাবে কাঁপুনি শুরু হলে সেলাই করার অনুরোধ জানান। এরপর তাঁর পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দুই সন্তানকেই চাই। আমার আরেক সন্তান কোথায়, তা জানতে চাই।’
এদিকে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা চিকিৎসক ডা. দিনা বলেন, তিনি সর্বশেষ একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করেছিলেন। মেশিনে যেভাবে দেখা গেছে, সেভাবেই রোগীকে জানিয়েছেন। তবে মেশিনে কখনো কখনো একটি শিশুর মাথা দুটি দেখা যেতে পারে। সে কারণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অস্ত্রোপচারে একটি শিশু জন্ম নেওয়ায় তাঁর ধারণা, আল্ট্রাসনোগ্রামে ভুল হতে পারে।
রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শরিফুল বলেন, চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের নির্দেশনায় ডা. দিনা আল্ট্রাসনোগ্রাম করেছিলেন এবং তিনি যমজ সন্তানের প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একটি সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা জানতে পেরেছেন। তাঁর মতে, আল্ট্রাসনোগ্রামের প্রতিবেদন নাকি অস্ত্রোপচারের ফলাফল—কোনটি সঠিক, তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই ব্যাখ্যা করতে পারবেন। তিনি দাবি করেন, যথাযথ নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হকও তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি নেই বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ওই নারীকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল এবং অস্ত্রোপচারও তিনিই করেছেন। অস্ত্রোপচারের পর নবজাতক পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। পুলিশ এসে সেই ফুটেজ দেখেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করে এনামুল হক বলেন, রোগীর স্বজনরাই তাঁকে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে দুই লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। তিনি বরং সবার সামনে বলেছিলেন, সিজারের খরচ রি-লাইফ কর্তৃপক্ষ বহন করবে। তবে স্বজনরা তা মেনে নেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিন্টু রহমান বলেন, বাদী এজাহার লিখছেন। এজাহার দায়েরের পর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পরই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগী পরিবার আবেদন করলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যমজ সন্তান জন্মের দাবি, দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদন, অস্ত্রোপচারের পর একটি নবজাতক পাওয়া এবং অপরটির বিষয়ে রহস্য—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দ্বিতীয় নবজাতকের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় ভুক্তভোগী পরিবার।