এড দামাজিনে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলার চিহ্ন শনাক্ত, সালি এলাকায় বিদ্রোহী জোটের অগ্রগতি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাড়ছে আঞ্চলিক উদ্বেগ।

সুদানের নীল নীল অঞ্চলে সংঘাতের বিস্তার, ড্রোন হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ও সালি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারাল সেনাবাহিনী

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার | ৮ নভেম্বর ২০২৬

সুদানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় নীল নীল রাজ্যে (Blue Nile State) সরকারি সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (RSF) মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। রাজ্যের রাজধানী এড দামাজিনে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। একই সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সালি এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সরকারি সেনাবাহিনী। ৭ নভেম্বর প্রকাশিত Sudan Tribune-এর প্রতিবেদনে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের Humanitarian Research Lab-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের বরাতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের Humanitarian Research Lab ৫ নভেম্বর প্রকাশিত তাদের ৮২ নম্বর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে ২৯ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এড দামাজিনে একাধিক স্থানে হামলার ক্ষয়ক্ষতির আলামত শনাক্ত করেছে। বিশ্লেষণে শহরের আল-জুহুর ও সাবেইন বাজারের আশপাশ এবং একটি মসজিদের বাইরে গোলাবারুদের আঘাত ও আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্তত ছয়টি স্থানে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ শনাক্ত হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৪তম আর্টিলারি ডিভিশনের ব্যারাকে একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। পাশাপাশি ৪র্থ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের ঘাঁটির সীমানায় ধ্বংসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, RSF এবং সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট-নর্থের (SPLM-N) যৌথ বাহিনী সালি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে ইয়েলের বিশ্লেষণে সমর্থন পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি শিবিরও ধ্বংস হয়েছে।

সংঘাতের পাশাপাশি এড দামাজিনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ইয়েলের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শহরের একটি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে এক মাসের মধ্যে ৮০০টির বেশি নতুন অস্থায়ী আশ্রয়স্থল তৈরি হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সংঘাতের কারণে নতুন করে অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছেন। একই সময়ে শহরের সাতটি জ্বালানি স্টেশনে দীর্ঘ সারির চিত্র পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দেয়।

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সরকারি সেনাবাহিনী ও RSF-এর মধ্যে ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ চলছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত ইতোমধ্যে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। নীল নীল রাজ্যের গুরুত্ব এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অঞ্চলটির সঙ্গে ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্ত রয়েছে। কুরমুক ও এড দামাজিনের মধ্যবর্তী যোগাযোগপথ সামরিক চলাচল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েলের বিশ্লেষণে ইথিওপিয়ার আসোসা এলাকায় সামরিক স্থাপনায় নির্মাণকাজ, পণ্য পরিবহন ও যানবাহনের তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে। তবে এসব কার্যক্রমকে RSF-কে ইথিওপিয়া সরকারের সরাসরি সহায়তার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে আরও স্বাধীন তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের ২০২৬ সালের অক্টোবরের নিরাপত্তা মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ৩০ জুলাই পর্যন্ত নীল নীল রাজ্যে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৫ জন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ অবস্থান করছিলেন। এটি সাম্প্রতিক হামলার পরের নতুন হিসাব নয়, বরং পূর্ববর্তী মানবিক পরিস্থিতির একটি পরিমাপ। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় ও জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরও বাড়তে পারে।

নীল নীল অঞ্চলের এই সংঘাত সুদানের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সুদানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও সুদানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, আফ্রিকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার সঙ্গে এই সংকটের সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহন বাজারেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, এড দামাজিনে ড্রোন হামলার ক্ষয়ক্ষতি এবং সালি এলাকার নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন নীল নীল রাজ্যে সংঘাতের নতুন বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সালি এলাকার নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনকে পুরো রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সমতুল্য বলা যাবে না। একইভাবে ইথিওপিয়ার সামরিক তৎপরতার তথ্য থেকে দেশটির সরাসরি যুদ্ধ-সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যায় না। আগামী দিনগুলোতে এড দামাজিনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, কুরমুকের যোগাযোগপথ, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এবং সুদান–ইথিওপিয়া সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com