ক্যাশলেস সোমালিয়া: নিজস্ব টাকা নেই, ডলারই ভরসা! কীভাবে চলছে দেশ?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি:

 

বিশ্বের যেকোনো দেশে কেনাকাটা বা লেনদেনের জন্য সাধারণত সেই দেশের নিজস্ব ব্যাংকনোট বা মুদ্রাই প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই নিয়মের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। এখানে কোনো কেনাকাটা করতে গেলে পকেটে সোমালিয়ার নিজস্ব কোনো কাগজের টাকা রাখার প্রয়োজন পড়ে না। দেশটির অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল মার্কিন ডলার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের ওপর।

 

এটিএম বুথে মিলছে ডলার, পকেটে নেই কাগুজে নোট। সোমালিয়ার রাস্তায় হাঁটলে বা দোকানে গেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। শাকসবজি কেনা থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর বিল মেটানো, কিংবা ট্যাক্সি ভাড়া—সবকিছুই মেটানো হচ্ছে ডলারে। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, দেশের যেকোনো এটিএম বুথে কার্ড গলিয়ে টাকা তুলতে গেলে সোমালিয়ার কোনো মুদ্রা নয়, বরং বেরিয়ে আসে চকচকে মার্কিন ডলার! বড় বড় শপিং মল তো বটেই, এমনকি ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছেও ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে ডলারে লেনদেন করা অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।

 

সোমালিয়ার একটি দাপ্তরিক মুদ্রা রয়েছে, যার নাম ‘সোমালি শিলিং। তবে বাস্তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোঠায়। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কারণ:

 

 দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: ১৯৯১ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর শুরু হয় টানা গৃহযুদ্ধ। ফলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি ও জাল নোটের দাপট: সরকারের অভাবের সুযোগে বিভিন্ন অসাধু গোষ্ঠী এবং মিলিশিয়া বাহিনী দেদারসে ভুয়া ও জাল ‘সোমালি শিলিং’ বাজারে ছাড়তে থাকে। এর ফলে শিলিংয়ের মান দ্রুত কমতে থাকে এবং সাধারণ মানুষ স্থানীয় মুদ্রার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। বিকল্প হিসেবে ডলারের আগমন: চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সঞ্চয় বাঁচিয়ে রাখতে সোমালিয়ার জনগণ বিকল্প হিসেবে স্থিতিশীল মুদ্রা মার্কিন ডলারকে বেছে নেয়। মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্যাশলেস বিপ্লব-কাগুজে সোমালি শিলিংয়ের অপ্রতুলতা এবং ছোট মূল্যমানের ডলারের সংকটের কারণে সোমালিয়ায় এক অভূতপূর্ব ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

 

সোমালিয়ার বড় বড় টেলিকম কোম্পানিগুলো (যেমন: Zaad, EVC Plus) অত্যন্ত সহজ মোবাইল আর্থিক সেবা চালু করে। এর মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র লেনদেনও (যেমন ৫০ সেন্ট বা এক ডলার) ফোনের এক ক্লিকেই সেরে ফেলা যায়। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বদলে এই মোবাইল ভলটে ডলার জমা রাখেন এবং ফোন নম্বর ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করেন।

 

যদিও মার্কিন ডলার সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, তবুও নিজস্ব মুদ্রার অভাব একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সোমালিয়ার বর্তমান সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও একটি নিরাপদ ও নতুন ‘সোমালি শিলিং’ বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে, যাতে দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাকে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা যায়।

 

তবে আপাতত, প্রযুক্তি ও মার্কিন ডলারের মেলবন্ধনে সোমালিয়া বিশ্বমঞ্চে এক অনবদ্য ক্যাশলেস এবং ডলারভিত্তিক সমাজের অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে!

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com