৭ নভেম্বরের চেতনা হোক গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়: নোবিপ্রবি উপাচার্য

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

মোঃ জাহিদ হাসান, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি:

৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি বলেছেন, বিপ্লবের সার্থকতা ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে। জাতীয় সংহতির প্রকৃত সার্থকতা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত।

আজ ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে নোবিপ্রবি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে উপাচার্য এসব কথা বলেন। আজ শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) নোবিপ্রবি বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। ওই সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মুক্তির ঘটনা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, পরবর্তী সময়ে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু হয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে তার নেওয়া উদ্যোগগুলোও দেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলে। ১৯ দফা কর্মসূচি, খাল খনন ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে তার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে; ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি পুনর্বহালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ। তবে কোনো ঐতিহাসিক দিবসকে দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সবার অংশগ্রহণ ও মূল্যবোধের জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়তে কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রপ্তানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার ঘটাতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের সার্থকতা নতুন আইন বা নতুন কাঠামো তৈরিতে নয়, সেই কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে তোলায়। রাষ্ট্র সবার, দেশ সবার, স্বাধীনতা সবার এবং উন্নয়নের সুফলও সবার। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও ঐক্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বর কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক, আত্মনির্ভরশীল, সাম্যভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অসমাপ্ত অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৭ই নভেম্বরের পটভূমিতে যে নেতৃত্বে ছিলেন তিনি হলেন বীর সেনানী, বীর উত্তম শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। যিনি কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ প্রথমবার এবং ২৭ মার্চ দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব তাকে ৭ই নভেম্বরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর আমরা একটা স্বাধীন ভূখন্ড পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা ছিলোনা। ১৯৭৫ সালে প্রথমে সংসদীয় নির্বাচন পদ্ধতি বাদ দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি চালু করা হয় এবং পরবর্তীতে একদলীয় বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রকাশকে সঙ্কুচিত করা হয়। চারিদিকে লুটপাট, রক্ষীবাহিনী গঠন করা এবং নিজেদের দলের লোকজনের পক্ষে ব্যবসায়িক লাইসেন্স নেওয়া হতো যা তারা বাইরে চড়া দামে বিক্রি করা হতো। পরবর্তীতে আগস্টের শেষে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হন এবং ৩রা নভেম্বর তাকে আটক ও গৃহবন্ধী করা হয়। পরে সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ৭ ই নভেম্বর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি প্রথমে প্রশাসন প্রধান হন এবং ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন এবং এরপরই তিনি বিএনপি নামে জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতিতে আবার নির্বচন দেন এবং এর মাধ্যমে বাকশাল রহিতকরণ হয়।

সভায় অন্যদের মাঝে আরও বক্তব্য প্রদান করেন নোবিপ্রবি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ, আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুন নবী, সেকশন অফিসার মো. জিয়াউর রহমান, শাখা কর্মকর্তা আবদুল কাদের রহমান, পরিবহন শাখার প্রধান সহকারী মিজানুর রহমান, বার্তা বাহক মোশারফ হোসেন, কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থী ও নোবিপ্রবি ছাত্রনেতা জাহিদ হাসান, ফিমস্ বিভাগের শিক্ষার্থী ও নোবিপ্রবি ছাত্রনেতা হাসিবুল হাসান হাসিব এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে সাখাওয়াত হোসেন সায়েম। এ সময় নোবিপ্রবি বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগের চেয়ারম্যান, হল প্রভোস্ট, দপ্তর ও শাখা প্রধান, ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

রেজিস্ট্রার তামজিদ হোছাইন চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নোবিপ্রবি ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. শিবলুর রহমান। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রূহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া পরিচালনা করেন নোবিপ্রবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. গিয়াস উদ্দীন ভূঁইয়া। এর আগে দিবসের কর্মসূচি শুরুতে নোবিপ্রবি গোলচত্বরে মুক্তিযুদ্ধের বেদিতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও যথাযথ ভাবগাম্বীর্যের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com