নেপাল
হিমালয়ের কোলে নেপাল কেন বারবার দুর্যোগের ফাঁদে?
হিমালয়ের কোলে নেপাল কেন বারবার দুর্যোগের ফাঁদে? ভূমিকম্প, হড়পা বান, ভূমিধস থেকে হিমবাহ—ভূগোলই কি ‘অভিশাপ’? বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার হিমালয়ের কোলে ছোট্ট দেশ নেপাল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই দেশটিই আবার বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। কখনও ভয়াবহ ভূমিকম্প, কখনও ভূমিধস, কখনও আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বান—প্রকৃতির একের পর এক আঘাতে বারবার বিপর্যস্ত হয় নেপালের জনজীবন। সাম্প্রতিক ঘটনাই তার ভয়াবহ উদাহরণ। ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে একটি বড় হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্রোত নদীতে নেমে আসে। পরে তা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও debris flow-তে রূপ নেয়। US Geological Survey (USGS)-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধস প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে গিয়ে নদীপথের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—নেপালেই কেন এমন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি এত বেশি? পাতের সংঘর্ষের ওপর দাঁড়িয়ে নেপাল এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে নেপালের ভূতাত্ত্বিক অবস্থানে। নেপাল ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত উত্তর দিকে সরে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে প্রবেশ ও তার সঙ্গে সংঘর্ষ করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী ভূ-প্রক্রিয়ার ফলেই হিমালয়ের সৃষ্টি এবং অঞ্চলটি এখনও অত্যন্ত সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক এলাকায় রয়েছে। ফলে নেপালে ভূমিকম্পের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। আর শক্তিশালী ভূমিকম্প শুধু ভবন ধসায় না—পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল করে ভূমিধস, তুষারধস ও নদীপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ গোরখা ভূমিকম্পের পরও হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ভূমিধস ও পাহাড়ি ধসের ঘটনা দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ একটি ভূমিকম্প অনেক সময় নিজেই শেষ বিপদ নয়; এর পর শুরু হতে পারে একাধিক ‘secondary hazard’। নেপালের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত দুর্গম। অল্প দূরত্বের মধ্যেই সমতল তরাই অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মিটার উচ্চতার পাহাড় ও পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই তীব্র উচ্চতার পার্থক্যের কারণে পাহাড়ের ঢাল অনেক জায়গায় অত্যন্ত খাড়া। বর্ষার প্রবল বৃষ্টি মাটির ভেতরে পানি ঢুকিয়ে ঢালের স্থিতিশীলতা কমিয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ভূমিধস নামতে পারে। আর পাহাড়ি নদীগুলো সরু উপত্যকা দিয়ে দ্রুতগতিতে নিচে নামে। ফলে ওপরের দিকে ভূমিধস, হিমবাহ ধস বা নদীপথে বাধা সৃষ্টি হলে নিচের জনপদে তার প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে খুবই কম। এই কারণেই নেপালে একটি দুর্যোগ অনেক সময় আরেকটি দুর্যোগকে ডেকে আনে—ভূমিধস থেকে নদী বন্ধ, নদী বন্ধ থেকে হ্রদ, পরে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা। নেপালের দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু। দেশটির বার্ষিক বৃষ্টিপাতের বড় অংশ মাত্র কয়েক মাসের বর্ষা মৌসুমে নেমে আসে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালের বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে তীব্র মৌসুমি বৃষ্টিপাত, দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং দুর্বল ভূতাত্ত্বিক গঠন একসঙ্গে কাজ করে। বিশেষ করে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢাল দ্রুত পানি শোষণ করে ভারী হয়ে ওঠে। তখন ভূমিধসের পাশাপাশি নদীর পানিও হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে নেপালের বর্ষা মানেই শুধু বৃষ্টি নয়—একসঙ্গে বন্যা, ভূমিধস, সড়ক বিচ্ছিন্নতা ও পাহাড়ি জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা। নেপালের আরেকটি বড় ঝুঁকি উচ্চ হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহজাত হ্রদ। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও বরফ গলছে, কোথাও নতুন বা বড় হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে। সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF—অর্থাৎ হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবন। আর সাম্প্রতিক বিপর্যয়টি দেখিয়েছে, বিপদ শুধু হিমবাহ-হ্রদ থেকেই আসতে হবে এমন নয়। পাহাড়ের ওপর হিমবাহ ও শিলাস্তরের অস্থিতিশীলতা থেকেও বিশাল ধস নেমে নদীকে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার উৎসে পরিণত করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন কি ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে? বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ এখানেই সবচেয়ে বেশি। উচ্চ হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ এবং পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটির বরফ গলে যাওয়ার ফলে পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমতে পারে। এতে ভূমিধস, শিলাধস, হিমবাহ ধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ঘটনাতেও বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। তবে একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের বসতিও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি নেপালের দুর্যোগের গল্পে শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। পাহাড়ি নদীর তীর, ভূমিধসপ্রবণ ঢাল এবং সংকীর্ণ উপত্যকার আশপাশে জনবসতি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে ওঠায় মানুষের ঝুঁকি বাড়ছে। কোথাও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কোথাও পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ বা অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রাকৃতিক ঢালের স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। ফলে দুর্যোগের ‘hazard’ যখন মানুষের বসতি ও অবকাঠামোর সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা পরিণত হয় বড় ধরনের ‘disaster’-এ। এক বিপদ থেকে আরেক বিপদ—নেপালের সবচেয়ে বড় সমস্যা নেপালের দুর্যোগকে তাই আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একটি ভূমিকম্প ভূমিধস ঘটাতে পারে। ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। নদীতে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে তার পেছনে পানি জমতে পারে। সেই বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে হড়পা বান। একইভাবে প্রবল বর্ষা ভূমিধস ঘটাতে পারে, আবার পাহাড়ি ঢালে জমে থাকা বরফ ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতাও বাড়াতে পারে। অর্থাৎ নেপালের প্রকৃত ঝুঁকি শুধু ‘বন্যা’ বা ‘ভূমিকম্প’ নয়—বরং একাধিক প্রাকৃতিক বিপদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও নেপালের এই compound বা cascading disaster risk-এর বিষয়টি উঠে এসেছে। তাহলে কি নেপালের দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব? প্রকৃতির ভূতাত্ত্বিক অবস্থান বদলানো সম্ভব নয়। হিমালয়ের অবস্থানও বদলাবে না। কিন্তু বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন— - ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল ও নদী অববাহিকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; - হিমবাহ ও হিমবাহজাত হ্রদের উন্নত মনিটরিং; - দ্রুত কার্যকর Early Warning System; - ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো; - ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত বসতি নিয়ন্ত্রণ; - পাহাড়ি সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কঠোর পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন; - স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ও উদ্ধার প্রস্তুতির আওতায় আনা। ভূগোল ‘অভিশাপ’ নয়, কিন্তু ঝুঁকির বাস্তবতা নেপাল প্রকৃতির রোষে বারবার পড়ে—এমন ধারণা পুরোপুরি ভুল নয়। তবে এর পেছনে কোনো অলৌকিক কারণ নেই। নেপালের অবস্থানই তাকে একই সঙ্গে ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা, হিমবাহ ধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। হিমালয়ের জন্ম যে ভূতাত্ত্বিক শক্তির কারণে, সেই শক্তিই আজও পাহাড়কে অস্থির রাখছে। বর্ষার বৃষ্টি সেই অস্থিরতাকে আরও বাড়ায়। আর উষ্ণ পৃথিবী হিমবাহ ও উচ্চ পর্বতাঞ্চলের ঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। তাই নেপালের সামনে প্রশ্নটি শুধু ‘পরের দুর্যোগ কবে?’ নয়। প্রশ্ন আরও বড়—পরের দুর্যোগ আসার আগেই কতটা প্রস্তুত হতে পারবে হিমালয়ের এই দেশ?
মালয়েশিয়ায় ৭২ বাংলাদেশি আটক
মালয়েশিয়ায় একটি কম্পিউটারের কারখানায় অভিযানে ৭২ জন বাংলাদেশি আটক হয়েছে। এ ছাড়াও ২৯৯ জন মিয়ানমারের, ২২ জন ভারতীয়, ৩ জন ইন্দোনেশীয়, ২ জন নেপালী, ১ জন পাকিস্তানি ও ফিলিপাইনের নাগরিকও রয়েছেন। সবমিলিয়ে মোট ৪০২ জন অবৈধ নাগরিককে আটক করে । এবং তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লেংগেং ইমিগ্রেশন ডিপোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।