ডায়াগনস্টিক
লাইসেন্সহীনতা ও পরীক্ষার রিপোর্টে অসঙ্গতি: পঞ্চগড়ে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক বন্ধ
পঞ্চগড়, ১২ আগস্ট ২০২৬: রোগীর পরীক্ষার রিপোর্টে বড় ধরনের অসঙ্গতি এবং বৈধ ও হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকায় পঞ্চগড় জেলা শহরের তেঁতুলিয়া রোডের আনোয়ার প্লাজায় অবস্থিত ‘মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে। এ সময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় হালনাগাদ কাগজপত্র ও বৈধ লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হয়। পরে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘটনার সূত্রপাত গত ১০ আগস্ট। লিভারের সমস্যায় ভোগা সাইদুজ্জামান রেজা (৪৪) পঞ্চগড় মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালে SGPT পরীক্ষা করান। সেখানে তার রিপোর্টে ফলাফল আসে ১২৭ U/L। একই দিন ফলাফল নিশ্চিত করতে তিনি মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পুনরায় পরীক্ষা করালে রিপোর্টে SGPT-এর মাত্রা দেখানো হয় ২৬.৭ U/L। দুটি রিপোর্টের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় সন্দেহ তৈরি হলে পরদিন পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তৃতীয়বার পরীক্ষা করান তিনি। সেখানে SGPT-এর ফলাফল আসে ১২১ U/L। এ ঘটনায় মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং ভুল রিপোর্টের কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে—এমন অভিযোগে ১১ আগস্ট পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন সাইদুজ্জামান রেজা। অভিযোগের পর বিষয়টি যাচাই করতে বুধবার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি দল প্রতিষ্ঠানটিতে পরিদর্শনে যায়। পরিদর্শনকালে প্রয়োজনীয় বৈধ ও হালনাগাদ লাইসেন্স না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির সামনে এ সংক্রান্ত নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়। পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রোগীর লিখিত অভিযোগের পর তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির হালনাগাদ ও বৈধ লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বৈধ লাইসেন্স সম্পন্ন না করা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যাবে না। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্মারক নং-সিএ-স/পঞ্চ/প্রশা/২০২৬/৯৪৫-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঝিনাইদহে নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে ১৯৮টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার
ঝিনাইদহ জেলায় নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে ১৯৮টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিমালা উপেক্ষা করে বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এতে রোগীরা যেমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে ভুল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২২৮টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে নিবন্ধিত রয়েছে মাত্র ৩০টি। প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই নিবন্ধনহীন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স কিংবা মানসম্মত চিকিৎসা সেবা ও ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগে জেলার ছয়টি উপজেলায় অন্তত ১৯ জন প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। যদিও প্রতিটি ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনিবন্ধিত ক্লিনিককে দায়ী করা হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত তদারকির অভাবে অনেক ক্লিনিক মালিক নিজেদের ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে বেসরকারি ক্লিনিকের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা থাকায় অনেক রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্লিনিক দালালের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে এবং রোগী ভর্তির বিপরীতে কমিশন প্রদান করে। এসব প্রতিষ্ঠানে নন-এসি কক্ষের ভাড়া ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং এসি কক্ষের ভাড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ঝিনাইদহ জেলা প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুন্সি আবু জাফর বলেন, নতুন সরকার অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে বারবার অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তিনি জানান, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবিতে শিগগিরই আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে। এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, অনিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটিকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জেলার অনিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।