বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো নিখোঁজের অভিযোগ; ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবসে প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সংঘাত ও দমননীতিতে কি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল?

নিখোঁজ মানুষ, নিঃশব্দ রাষ্ট্র: গুম কি এখনও বিশ্বের অদৃশ্য অস্ত্র?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার

একজন মানুষ নিখোঁজ হলেন। পরিবার থানায় গেল, আদালতে গেল, প্রশাসনের দ্বারস্থ হলো—কিন্তু মিলল না তাঁর অবস্থানের নিশ্চিত তথ্য। তিনি জীবিত কি না, কোথায় আছেন, কী ঘটেছে—সবই রয়ে গেল অজানা। বছরের পর বছর এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকা পরিবারের জন্য গুম তাই শুধু একজন মানুষ হারানোর ঘটনা নয়; এটি সত্য, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দীর্ঘ লড়াই।

প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances-এর নথিতে বিভিন্ন দেশ থেকে এ ধরনের ৬২,৯০৪টি মামলা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। তবে এটি বিশ্বের মোট গুমের সংখ্যা নয়; আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নথিভুক্ত মামলার হিসাব।

গুমের প্রকৃত চিত্র নির্ণয় কঠিন। কারণ অনেক পরিবার অভিযোগ করতে ভয় পায়, কোথাও তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত, আবার অনেক ঘটনা যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ফলে সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথির সংখ্যা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়।

বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ তদন্তে জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনে ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা এবং তদন্তে প্রমাণিত গুমের সংখ্যা এক নয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথিতেও সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সময়সীমা ও পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাই বাংলাদেশে গুমের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে এখনো সতর্কতা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিখোঁজদের কতজনের সন্ধান মিলেছে, কতজন এখনও নিখোঁজ এবং কতটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে?

এই তিনটি তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ না হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না।‘আয়না ঘর’ থেকে জবাবদিহির প্রশ্ন

বাংলাদেশে কথিত গোপন আটককেন্দ্র ‘আয়না ঘর’ গুমের বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের মূল বিষয় শুধু স্থাপনা শনাক্ত করা নয়; বরং কে সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, কারা আটক ছিলেন, কী নথি ছিল এবং পরে তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

CCTV, মোবাইল ফোনের তথ্য, যানবাহনের গতিপথ, ডিউটি রোস্টার, আটক রেজিস্টার ও সরকারি নির্দেশনা—এসব ডিজিটাল ও নথিগত প্রমাণই অভিযোগকে প্রমাণভিত্তিক তদন্তে নিয়ে যেতে পারে।

 

গুমের আন্তর্জাতিক চিত্রে সাংবাদিকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। Reporters Without Borders-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত ১৩৭ সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ৪৬ জন জোরপূর্বক গুমের শিকার। এসব ঘটনা ২২টি দেশ ও চারটি মহাদেশে ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ গুম শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রশ্ন নয়; সত্য অনুসন্ধান, তথ্য প্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

সশস্ত্র সংঘাত গুমের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। ইউক্রেন, সিরিয়া ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান নির্ধারণ এখনও বড় মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তি, বেসামরিক নাগরিক ও নিখোঁজদের তথ্য গোপন হলে পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হয়।

বাংলাদেশে ২০২৬ সালে enforced disappearance প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইনি কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটির তদন্তব্যবস্থা, স্বাধীনতা, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীর প্রতিকার নিয়ে আরও শক্তিশালী নিশ্চয়তার দাবি জানিয়েছে। কারণ আইন তৈরি করাই শেষ নয়—অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালীই হোক, তদন্ত ও বিচার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেটিই আসল পরীক্ষা।

গুমের ক্ষতি শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উপার্জনক্ষম সদস্য হারালে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সন্তানরা অভিভাবক হারায়। আর পরিবার সবচেয়ে বেশি ভোগে অনিশ্চয়তায়।

মৃত্যু হলে শোকের একটি পরিসমাপ্তি থাকে। গুমের ক্ষেত্রে থাকে শুধু প্রশ্ন—

“সে কোথায়?” এই অনিশ্চয়তাই গুমকে অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে আলাদা করে।

গুমের অভিযোগের কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় ডাটাবেস, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষী সুরক্ষা, পরিবারের আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের নিরপেক্ষ বিচার। একই সঙ্গে অভিযোগ, যাচাই করা ঘটনা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করা জরুরি।

 

গুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ প্রতিশোধ নয়—সত্য উদঘাটন।

একজন মানুষ কোথায় গেলেন, তাঁর কী হয়েছিল এবং কে দায়ী—এই তিন প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটি পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয় না।

৩০ আগস্ট তাই শুধু নিখোঁজদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলার দিন।

একজন নাগরিক নিখোঁজ হলে রাষ্ট্র কি শুধু তাঁকে খুঁজবে, নাকি সত্যটাও খুঁজবে?

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com