গ্যাস আছে, কিন্তু চুলায় নেই: ঢাকার মানুষের দিন কাটছে অপেক্ষায়
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার:
ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সকাল শুরু হওয়ার কথা ছিল রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু অনেক পরিবারের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। চুলার নব ঘুরিয়েও কাঙ্ক্ষিত আগুন মিলছে না; কোথাও সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না শেষ করা কঠিন। বাধ্য হয়ে কেউ electric stove, কেউ induction cooker, আবার কেউ মাটির চুলা বা LPG সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে গ্যাসের সংকট শুধু একটি জ্বালানি সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন নগরজীবনের সময়, ব্যয় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে বিকল্প চুলা ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দেশে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, তাহলে ঢাকার অনেক বাসাবাড়ির চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না কেন? তথ্য বলছে, Titas-এর বিতরণ নেটওয়ার্কে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ বিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ১.৫ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ Titas-এর আওতাধীন বিস্তীর্ণ এলাকায়।
গ্যাসের এই ঘাটতির পেছনে LNG সরবরাহের অস্থিরতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি LNG টার্মিনালে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সরবরাহ প্রায় ৪৫০ mmcfd কমে যাওয়ার কথা Titas জানিয়েছিল। তখন Titas-এর আওতাধীন সব ধরনের গ্রাহককে তীব্র নিম্নচাপের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। পরবর্তী সময়ে LNG সরবরাহে ওঠানামা অব্যাহত থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। এক পর্যায়ে জাতীয় দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ mmcfd-এর বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১,৯৩০ mmcfd-এ নেমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
কিন্তু সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরে থেমে নেই। ঢাকার রাস্তায় CNGচালকদের জন্য তৈরি হয়েছে আরেক বাস্তবতা। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক CNG স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। একজন চালককে একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে যদি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তার দৈনিক ট্রিপ কমে যায়, আয় কমে যায় এবং সেই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থার ওপরও পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্যাস-সংকটের কারণে CNG স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ queues-এর কথা উঠে এসেছে।
একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলেও সংকটের অভিঘাত স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশের শিল্প এলাকায় নিম্ন গ্যাসচাপের কারণে বহু কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নরসিংদীতেই ৩০০-এর বেশি ছোট-বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার দাবি এসেছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের রান্নাঘরের যে সংকট, তার সঙ্গে দেশের উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসের সংকট আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও চাপ তৈরি করছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হওয়ায় সরবরাহ কমে গেলে gas-fired power plants-এ উৎপাদন কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে load shedding বৃদ্ধির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে একজন নগরবাসী একই সময়ে দুটি সংকটের মুখোমুখি হতে পারেন—চুলায় গ্যাস নেই, আবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা electric stove চালাতেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। ফলে LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস এবং পর্যাপ্ত নতুন অনুসন্ধান না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটকে শুধু একটি LNG terminal-এর কারিগরি ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দিকটি আড়ালে থেকে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দেশের গ্যাস বিতরণ অবকাঠামো। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো distribution ও service line পরিবর্তনের কাজ চলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তাই অনুসন্ধানের প্রয়োজন—কত কিলোমিটার পাইপলাইন পুরোনো, কোথায় leakage বেশি, কোথায় network upgrade প্রয়োজন এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজ কতটা এগিয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস-সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এক নয়। তাৎক্ষণিকভাবে LNG supply স্বাভাবিক করা, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখা এবং বিতরণব্যবস্থায় চাপের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, LNG নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। একটি পরিবারকে যখন রান্নার জন্য electric stove বা LPG কিনতে হয়, CNGচালককে যখন দীর্ঘ সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কারখানাকে যখন generator চালাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যখন গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ে—তখন গ্যাসের সংকট আর শুধু “energy sector-এর সমস্যা” থাকে না। এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতির সমস্যা হয়ে ওঠে।
এই প্রতিবেদনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ঢাকার অন্তত পাঁচটি এলাকার বাসিন্দা, কয়েকটি CNG স্টেশনের চালক ও কর্মী, restaurant ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে Titas Gas, Petrobangla, RPGCL এবং বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানতে হবে—বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ কী এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের হাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা কতটা আছে।
সবশেষে প্রশ্নটি খুব সরল: গ্যাসের জন্য মানুষ যদি প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সেই অপেক্ষার মূল্য কে দিচ্ছে? একজন গৃহিণী অতিরিক্ত সময় দিয়ে, একজন CNGচালক আয় হারিয়ে, একজন কারখানা মালিক উৎপাদন কমিয়ে এবং একজন শ্রমিক কর্মঘণ্টা হারিয়ে—সবাই কি একই সংকটের আলাদা আলাদা মূল্য পরিশোধ করছেন?
ঢাকার রান্নাঘরের ছোট্ট একটি আগুনের শিখা তাই আজ দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—গ্যাস কি সত্যিই নেই, নাকি সরবরাহব্যবস্থার কোথাও গিয়ে সাধারণ মানুষের চুলায় পৌঁছানোর আগেই তার সংকট শুরু হয়ে যাচ্ছে?