গ্যাস সংকট, লোডশেডিং ও শিল্পের স্থবিরতা: জ্বালানি নিরাপত্তায় কোথায় আমাদের ঘাটতি?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর জ্বালানি সংকটের অভিঘাত আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে লোডশেডিং। রাজধানী থেকে গ্রাম—কোথাও বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে, কোথাও গ্যাসের স্বল্পচাপে রান্নার চুলা জ্বলছে না। একই সঙ্গে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সংকটটি আর কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পোৎপাদন ও জনজীবনের সর্বত্র।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, গ্যাস সরবরাহের ওপর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের নির্ভরতা কতটা গভীর। এলএনজি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। আর উৎপাদন কমলে বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ে, যার অনিবার্য পরিণতি লোডশেডিং।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর এবং গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকা শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থী, রোগী, শিশু, প্রবীণ এবং কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাখাতও ক্ষতির মুখে পড়ে।

 

গ্যাস সংকটের মূল চিত্র

 

বাংলাদেশের গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরেই একটি কাঠামোগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি থাকলেও বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়ায় উৎপাদন ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হচ্ছে। বিপরীতে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও নগরায়ণের কারণে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে।

এই ব্যবধান পূরণে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ-এর মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যবস্থারও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। টার্মিনাল সংস্কার, কারিগরি ত্রুটি, কার্গো সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা—যেকোনো একটি কারণেই আমদানিনির্ভর সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সংকট তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সক্ষমতার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহ করা মানেই জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের ঘাটতি। আর সেই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বিভিন্ন খাতে রেশনিং করতে হয়। শিল্পে গ্যাস কমলে উৎপাদন কমে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, আর আবাসিক এলাকায় চাপ কমলে রান্নার চুলা পর্যন্ত জ্বলে না।

 

শিল্পের চাকা থেমে গেলে ক্ষতি শুধু মালিকের নয়

 

নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর কিংবা ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলের চিত্র আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত কাঁচামাল পড়ে থাকছে, কিন্তু গ্যাসের অভাবে যন্ত্রপাতি চালানো যাচ্ছে না।

একটি শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণের কিস্তি, সরবরাহকারীর ব্যবসা, পরিবহন খাত এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব। উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে উদ্যোক্তারা আর্থিক সংকটে পড়বেন এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। শিল্পোদ্যোক্তারা শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিল দেন না; তাঁদের কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও অন্যান্য নির্ধারিত খরচ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এসব ব্যয় বন্ধ থাকে না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট শিল্পের আর্থিক সক্ষমতাকে দ্রুত দুর্বল করে দিতে পারে।

 

সংকট কি কেবল সাময়িক?

 

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—এটি কি নিছক সাময়িক সরবরাহ সংকট, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট?

বাস্তবতা বলছে, দুটিই সত্য। এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা কিংবা কার্গো না আসার মতো তাৎক্ষণিক কারণ সংকটকে তীব্র করতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যাটি আরও গভীরে। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমছে, অথচ চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আবার এলএনজি আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—সবকিছুই এই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অতএব, শুধু আরও কয়েকটি এলএনজি কার্গো আমদানি করে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আজকের ঘাটতি আগামীকাল আবার ফিরে আসতে পারে, যদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি না আসে।

 

জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার করতে হবে

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্ক সরাসরি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া শিল্পায়ন টেকসই হতে পারে না। নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বাড়ানো কিংবা উৎপাদনশীলতা উন্নত করা—সবকিছুর পূর্বশর্ত হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ।

তাই জ্বালানি খাতকে শুধু সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা।

প্রথমত, দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান আরও জোরদার করতে হবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর সর্বোচ্চ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টার্মিনাল ও পাইপলাইন অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলে যাতে পুরো সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, গ্যাস ব্যবহারে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক যুক্তি অনুসরণ করতে হবে। কোন খাতে কত গ্যাস যাবে, সংকটের সময়ে কীভাবে রেশনিং হবে এবং কোন খাতকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে একটি পূর্বনির্ধারিত ও জনসম্মুখে ব্যাখ্যাযোগ্য নীতি থাকা দরকার।

চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানির বহুমুখীকরণ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন জরুরি।

 

জনগণের দুর্ভোগকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে

 

জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর মানবিক মূল্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন মা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নার চুলার পাশে বসে থাকেন, একজন সিএনজি চালক যখন গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেন, একজন শ্রমিক যখন কাজ না থাকায় কারখানার সামনে বসে থাকেন কিংবা একজন শিক্ষার্থী যখন বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়—তখন সংকটের প্রকৃত মূল্যটি বোঝা যায়।

জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সাফল্য তাই শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে মাপা যাবে না। জনগণ কতটা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছে, শিল্প কতটা সচল থাকছে এবং অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল থাকছে—সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

 

সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময়

 

বর্তমান গ্যাস সংকটকে কেবল একটি সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাগুলো নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

দেশীয় গ্যাসের মজুত কমছে, চাহিদা বাড়ছে, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে—এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতাও ঝুঁকিতে পড়বে।

তাই এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি কৌশল; সাময়িক জোড়াতালি নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; সংকট দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া নয়, সংকটের আগেই প্রস্তুতি।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে। গ্যাসের চুলা জ্বলবে, কারখানার চাকা ঘুরবে এবং মানুষের ঘরে বিদ্যুতের আলো থাকবে—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একই জ্বালানি নিরাপত্তার তিনটি অবিচ্ছেদ্য দিক।

বর্তমান সংকট তাই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো খাতভিত্তিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, জনজীবন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এখন প্রয়োজন সেই উপলব্ধিকে কার্যকর নীতি ও দূরদর্শী পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।

 

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com