র্যাব থেকে এসআরবি: নাম বদলেই কি বদলাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০ পিএম
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। মাদক, সন্ত্রাস, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা অপরাধ মোকাবিলায় সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ দক্ষতা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণসম্পন্ন ইউনিট থাকা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থারই অংশ। প্রশ্নটি তাই বিশেষায়িত বাহিনী থাকবে কি থাকবে না—এখানে নয়; বরং প্রশ্ন হলো, সেই বাহিনী কতটা আইনের অধীন, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল হবে।
র্যাবের পরিবর্তে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি গঠনের প্রস্তাবকে এই বৃহত্তর প্রশ্নের জায়গা থেকেই দেখা প্রয়োজন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এসআরবি আইনের খসড়া সম্পর্কে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে র্যাব বিলুপ্ত হলেও র্যাবের জনবল, সম্পদ, তহবিল, নথি, দায়দায়িত্ব এবং চলমান আইনি কার্যক্রমের বড় অংশ এসআরবিতে স্থানান্তরের কথা রয়েছে। এমনকি র্যাবে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।
অর্থাৎ, এখানে মূল প্রশ্নটি নাম পরিবর্তনের নয়; প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের পরিবর্তন কতটা হচ্ছে—সেটিই আসল।
অতীতের দায় থেকে শিক্ষা নিতে হবে
র্যাব বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বাহিনীটির বিভিন্ন অভিযান জনমনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে বাহিনীটির বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালার মতো গুরুতর অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানেও র্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে অতীতের এসব অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে শুধু নতুন নাম ও নতুন পোশাকে একটি বাহিনীকে সামনে আনা হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা বাড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার মানে শুধু নাম পরিবর্তন নয়। সংস্কার মানে হলো—যে কাঠামোতে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেই কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে তা আমূল পরিবর্তন করা।
শক্তিশালী বাহিনী দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার শক্তিশালী আইন
এসআরবিকে অপরাধ দমন ও তদন্তের বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতার কথাও খসড়ায় উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে।
এই ক্ষমতাগুলো রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই হয়তো জরুরি হতে পারে। কিন্তু যত বেশি ক্ষমতা দেওয়া হবে, তত বেশি জবাবদিহির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ক্ষমতাকে দুর্বল করা নয়; বরং ক্ষমতার প্রয়োগকে কঠোর আইন, স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নজরদারির আওতায় আনা।
একজন নাগরিক কখন গ্রেপ্তার হলেন, কোথায় রাখা হলো, কখন আদালতে নেওয়া হলো, তাঁর আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি। বিশেষ করে অতীতে হেফাজত ও গোপন বন্দিশালা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকা একটি বাহিনীর উত্তরসূরি ইউনিটের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষাগুলো আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত।
অভিযোগ প্রতিকার কমিটি যথেষ্ট নয়
এসআরবি আইনের খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ ও বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটির কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু কমিটির স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে তার গঠন, ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নিশ্চয়তার ওপর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচ সদস্যের চারজনই সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা হবেন।
এখানেই প্রশ্ন।
যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বড় অংশ যদি অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে সাধারণ নাগরিক কতটা আস্থা পাবেন?
অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন নাগরিক প্রতিনিধি, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী কিংবা অবসরপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় ব্যক্তিদের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় না; অভিযোগের তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, সিদ্ধান্ত এবং শাস্তি বাস্তবায়ন—পুরো প্রক্রিয়াটিই স্বাধীন হতে হবে।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংযুক্তির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ
এসআরবিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়েও নতুন করে ভাবার অবকাশ আছে।
সশস্ত্র বাহিনীর মূল দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিশেষ ইউনিটের দায়িত্ব এক নয়। একটি বিশেষ বাহিনীতে সামরিক সদস্যদের সংযুক্তি যদি প্রয়োজনীয় হয়ও, তার স্পষ্ট আইনি সীমা, কমান্ড কাঠামো এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো কর্মকর্তা কোন কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন—এটি অস্পষ্ট হলে ভবিষ্যতে আবারও দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোয় দ্বৈত কমান্ড বা অস্পষ্ট জবাবদিহি কখনোই কাম্য নয়।
রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করাই হবে সবচেয়ে বড় সংস্কার
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো—ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ও নির্দেশনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের প্রবণতা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, অতীতে রাজনৈতিক সরকার বাহিনীকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নতুন আইনে এসব জায়গায় পরিবর্তনের চেষ্টা রয়েছে এবং আইন কতটা কার্যকর হবে তা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও নির্ভর করবে।
এই বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
কারণ সবচেয়ে ভালো আইনও যদি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্টভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে পারে না। আবার শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তাই এসআরবির প্রকৃত পরীক্ষা হবে কোনো বিশেষ সরকারের আমলে নয়; বরং সরকার পরিবর্তনের পরও এটি একই নিয়মে, একই পেশাদারিত্বে এবং একই জবাবদিহির কাঠামোয় কাজ করতে পারে কি না—সেখানে।
নাম নয়, আস্থার সংস্কার প্রয়োজন
র্যাবের নাম বদলে এসআরবি করা হলে বাহিনীর পোশাক বদলাতে পারে, সাংগঠনিক নাম বদলাতে পারে, আইনি ভিত্তি বদলাতে পারে। কিন্তু জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে তখনই, যখন তারা বিশ্বাস করবে—এই বাহিনী অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু নিরপরাধ নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আরও কঠোর।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সমন্বয়ই হলো প্রকৃত নিরাপত্তা।
এসআরবি যদি সত্যিই নতুন যুগের বিশেষায়িত বাহিনী হতে চায়, তাহলে তাকে র্যাবের উত্তরসূরি হিসেবে নয়, র্যাবের অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া একটি নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে।
সেখানে প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ নিয়োগ ও বদলি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত কমান্ড, স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত, হেফাজতে কঠোর নজরদারি, প্রতিটি গ্রেপ্তারের ডিজিটাল রেকর্ড, আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিশ্চয়তা, আদালতের কার্যকর তদারকি এবং গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো বাহিনীই রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নয়—এই নীতিটি আইনে এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
র্যাব বিলুপ্ত হলো কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত নামের প্রশ্ন। কিন্তু এসআরবি সত্যিই নতুন হলো কি না—সেটিই বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য বড় পরীক্ষা।
রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োজন। কিন্তু সেই শক্তির সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে—সে শক্তি কতটা সংযত, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা জবাবদিহিমূলক।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।