সতর্কবার্তা কোথায় হারাল? হিমালয়ের জলপ্রলয়ে ১৬৫ মৃত্যু, নিখোঁজ ৮২৬
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার:
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও বরফ-পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে ৮২৬ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৭৩ জন আহত। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৭৯ জন পর্যটক; তাঁদের ৪৬৬ জন বিদেশি। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ পর্যন্ত বলা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিপর্যয়ের কেন্দ্র নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশি নদী। তিব্বতের দিকে নদীর প্রবাহে বরফ-পাথরের ধস ও অস্থায়ী বাধা তৈরি হওয়ার পর হঠাৎ বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্রোত ভোটেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে নারায়ণী নদীর দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক প্রযুক্তিগত হিসাবে শুধু দেবঘাট এলাকা দিয়ে প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয়েছে।
এখানেই দুর্যোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নেপালের Flood Forecasting Division-এর প্রযুক্তিগত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকাল ৯:০৫টায় তিব্বত দিক থেকে বড় ঢল ভোটেকোশিতে প্রবেশের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ৯:১৫–৯:১৬টার মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী এলাকায় ৬ লাখের বেশি SMS সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
কিন্তু এর আগেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশন নীরব হয়ে যায়। সকাল ৮:৫০টায় Syabrubesi-এর স্বয়ংক্রিয় পানি-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ডেটা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শেষ রিডিং ছিল ১.৬২ মিটার। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে তিব্বত থেকে ভয়াবহ ঢলের তথ্য আসে। ৯:২০টায় Betrawati পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও ডেটা পাঠানো বন্ধ করে।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নয়। বড় প্রশ্ন—বিপদ শনাক্ত হওয়া, তথ্য সীমান্ত পেরিয়ে আসা এবং মানুষের কাছে সতর্কতা পৌঁছানোর মধ্যে কতটা কার্যকর সময় ছিল?
বন্যায় অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ধ্বংস হয়েছে। নয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্তমুখী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিমুরে ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, পানি ও কাদার স্রোত মুহূর্তের মধ্যে বাজার ও যানবাহন ভাসিয়ে নেয়। সীমান্ত এলাকায় থাকা শত শত যানবাহনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
নেপালের সরকারি হিসাবে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে ৫৭৯ জন পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ৪৬৬ জন বিদেশি। ভারতীয়, মার্কিন, ইউক্রেনীয়, অস্ট্রেলীয় ও ব্রিটিশ নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। অনেকেই কৈলাস-মানসসরোবরের পথে ছিলেন।
তিব্বতের গিরং এলাকাতেও ৫৫৮ জন নিখোঁজ এবং তিনজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ফলে দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
নেপালের সরকারি হিসাবে ৭৩ জন আহত হয়েছেন। উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর হাজারো সদস্য অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় খাবার, চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো হচ্ছে। নদীর তীর, ধ্বংসস্তূপ ও নিম্নাঞ্চলে নিখোঁজদের সন্ধান চলছে।
বন্যার আগে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছিল। প্রথমে সেটিকেই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে ভূমিকম্পকে মূল ট্রিগার হিসেবে নিশ্চিত করা যায়নি। স্যাটেলাইট ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বরং বরফ-পাথরের বিশাল ধস এবং নদীর প্রবাহে অস্থায়ী বাধা তৈরির বিষয়টি সামনে এসেছে।
এই দুর্যোগ দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি আকস্মিক বন্যায় কয়েক মিনিটের সতর্কতাও জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। নেপাল সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে—এটি সরকারি তথ্যেই স্পষ্ট। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ স্টেশনগুলো কেন বিপর্যয়ের ঠিক আগে ডেটা হারাল, তিব্বত থেকে তথ্য কত দ্রুত এলো এবং স্থানীয় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো সময় আদৌ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।
এ কারণেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর নয়। এটি সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদান, আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি, পর্যটন নিরাপত্তা এবং হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগ প্রস্তুতির বড় পরীক্ষা।
সর্বশেষ সরকারি চিত্র:
মৃত — ১৬৫ | নিখোঁজ — ৮২৬ | আহত — ৭৩ | নিখোঁজ পর্যটক — ৫৭৯ | বিদেশি নিখোঁজ পর্যটক — ৪৬৬ | ধ্বংস সেতু — ১৯ | ধ্বংস সড়ক — প্রায় ৪০ কিলোমিটার।
মূল অনুসন্ধানী প্রশ্ন একটাই—সতর্কবার্তা কি দেওয়া হয়েছিল, নাকি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই হিমালয়ের জলপ্রলয় তাদের ঘিরে ফেলেছিল?