অন্যের সৌন্দর্য গড়তে গিয়ে যাঁদের জীবন ম্লান: তাঁতীবাজারের স্বর্ণশিল্পীদের করুণ রূপকথা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম
সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি:
সোনার হার, চুড়ি, কানের দুল কিংবা আংটি—একটি অলংকার যখন কারও শরীরে ঝলমল করে ওঠে, তখন চোখে পড়ে শুধু তার সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কতজন জানেন? পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাঁতীবাজারের সরু গলিতে ঢুকলেই পাওয়া যায় সেই গল্পের অন্য অধ্যায়। ছোট ছোট কারখানার অন্ধকার ও ঘিঞ্জি পরিবেশে, আগুনের তাপ, ধাতব ধুলো, রাসায়নিকের ধোঁয়া এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মধ্যে দিনের পর দিন কাজ করে চলেছেন স্বর্ণশিল্পীরা। তাঁদের নিপুণ হাত অন্যের জীবনে সৌন্দর্য যোগ করে, অথচ সেই হাতগুলোর মালিকদের নিজেদের জীবনেই জমে আছে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা ও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
স্বর্ণালংকার তৈরির কাজ নিছক হাতের কারুকাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগুন, ধাতব ধুলো, অ্যাসিড এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার। তাঁতীবাজারের স্বর্ণকারদের কর্মপরিবেশ নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় অলংকার তৈরির বিভিন্ন ধাপে ক্যাডমিয়াম, নাইট্রিক অ্যাসিড ও সালফিউরিক অ্যাসিডসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। এসব পদার্থ থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া ও ধুলো দীর্ঘসময় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় স্বর্ণশিল্পীদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, পিঠব্যথা ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেক গবেষণায় তাঁতীবাজারের স্বর্ণালংকার তৈরির কারখানার ধুলো ও ছাইয়ে ক্ষতিকর ধাতু এবং সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় PM10, PM2.5 ও ন্যানোপার্টিকেলের পাশাপাশি ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিকের মতো বিষাক্ত উপাদানও পাওয়া গেছে। ফলে যে সোনার গয়না মানুষের চোখে সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, সেটি তৈরির কর্মস্থলই অনেক কারিগরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির জায়গায় পরিণত হয়েছে।
তাঁতীবাজারের অনেক কারখানা ছোট ও ঘিঞ্জি। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব, দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে বসে বা ঝুঁকে কাজ করা এবং আগুন ও রাসায়নিকের সংস্পর্শ—সব মিলিয়ে কর্মপরিবেশ হয়ে উঠেছে কঠিন। গবেষণায় স্বর্ণশিল্পীদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মধ্যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, পিঠব্যথা ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য।
একজন কারিগর দিনের পর দিন সূক্ষ্ম নকশার দিকে চোখ রেখে কাজ করেন। অথচ সেই কাজই যখন ধীরে ধীরে তাঁর চোখের দৃষ্টিকে দুর্বল করে দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—অন্যকে সাজানোর এই শিল্পের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দিচ্ছেন? তাঁদের দক্ষতা তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। একজন নতুন কারিগরকে অভিজ্ঞ কারিগরের কাছে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ শিখতে হয়। সামান্য ভুলে মূল্যবান ধাতু নষ্ট হতে পারে বলে প্রতিটি কাট, প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি নকশায় প্রয়োজন অসাধারণ মনোযোগ ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বিপরীতে তাঁদের কর্মজীবনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তাঁতীবাজারের স্বর্ণশিল্প শুধু একটি পেশা নয়; এটি বহু পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য। কিন্তু স্বর্ণের উচ্চমূল্য, বাজারের পরিবর্তন, গহনার চাহিদার ওঠানামা এবং যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের প্রসারের কারণে ঐতিহ্যবাহী কারিগররা ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছেন। ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, একসময় ঢাকায় প্রায় ১৫ হাজার স্বর্ণশিল্পী থাকলেও বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা ৫ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই পেশায় আগ্রহ কমছে।
এই সংকট অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে কাজের সংকটের কারণে অনেক স্বর্ণশিল্পীর পেশা পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছিল। কেউ চালকের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কেউ আবার সবজি বিক্রির মতো অন্য পেশায় চলে গেছেন। অর্থাৎ শুধু কারিগরের সংখ্যা কমছে না; তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য, দক্ষতা ও প্রজন্মান্তরে চলে আসা কারুশিল্পের জ্ঞান।
স্বর্ণশিল্পীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০ জন মৃত স্বর্ণশিল্পীর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণায় হৃদ্রোগকে গুরুত্বপূর্ণ মৃত্যুঝুঁকি হিসেবে পাওয়া যায়। এর আগে প্রকাশিত গবেষণা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি স্বর্ণকারদের গড় আয়ু জাতীয় গড়ের তুলনায় কম হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছিল। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রতিটি কারণকে সরাসরি শুধু কর্মপরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার আগে আরও বিস্তৃত ও হালনাগাদ মহামারিবিদ্যাগত গবেষণা প্রয়োজন—এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, যে মানুষটি একটি অলংকার তৈরিতে নিজের চোখ, হাত, মেধা ও সময় ব্যয় করেন, তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ অনেক সময়ই অনিশ্চিত। অসুস্থ হলে নিয়মিত চিকিৎসা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা অবসরকালীন নিরাপত্তার মতো সুবিধা কতজন কারিগর পান—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র।
একজন দক্ষ স্বর্ণশিল্পী রাতারাতি তৈরি হন না। তাঁকে তৈরি করতে লাগে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা। অথচ সেই দক্ষ মানুষটিই যখন বয়সের ভারে বা অসুস্থতায় কাজের সক্ষমতা হারান, তখন তাঁর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো কতটা প্রস্তুত—সেটিই বড় প্রশ্ন। দক্ষ কারিগরদের হারিয়ে ফেললে শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষই হারিয়ে যান না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পও।
তাঁতীবাজার শুধু একটি বাজার নয়; এটি বাংলাদেশের নগর কারুশিল্পের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে তৈরি হওয়া হাতে গড়া অলংকারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের জীবন, সংস্কৃতি ও পেশাগত ঐতিহ্য। কিন্তু তরুণেরা যদি এই পেশায় না আসেন, দক্ষ কারিগররা যদি অন্য পেশায় চলে যান এবং পুরোনো কারিগররা যদি কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই কর্মজীবন শেষ করেন, তাহলে একদিন হয়তো থাকবে আধুনিক গহনার দোকান—কিন্তু থাকবে না সেই গহনা তৈরির পুরোনো কারিগরি ঐতিহ্য।
তাই এখনই প্রয়োজন স্বর্ণশিল্পীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কারখানায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, কার্যকর ভেন্টিলেশন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দক্ষ কারিগরদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁদের শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের ধারক ও বাহক হিসেবেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আমরা যখন কারও গলায় সোনার হার দেখি, তখন তার ঝলক দেখি; দেখি না সেই হার তৈরির পেছনে থাকা শ্রমিকের ক্লান্ত চোখ। দেখি না আগুনের তাপ, রাসায়নিকের ধোঁয়া কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে থাকার যন্ত্রণা। যে হাত অন্যের সৌন্দর্য গড়ে, সেই হাতের জীবনও সুন্দর ও নিরাপদ হওয়া দরকার।
তাঁতীবাজারের স্বর্ণশিল্পীদের প্রশ্ন তাই শুধু তাঁদের নিজেদের নয়; এটি শ্রমিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন। আজ যদি তাঁদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে একদিন হয়তো সোনার অলংকার থাকবে—কিন্তু সেই অলংকার তৈরির ঐতিহ্যবাহী হাতগুলো আর থাকবে না।