পাঁচ টাকার নোট থেকে বাস্তবের কুসুম্বা মসজিদ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

মোঃ রমজান হোসেন নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ। সময়ের নানা পরিবর্তন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেরিয়ে আজও স্ব-গৌরবে টিকে থাকা এই মসজিদ শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক মূল্যবান নিদর্শন।

অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক সৌন্দর্যের কারণে দেশের পাঁচ টাকার নোটেও স্থান পেয়েছে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি। ফলে ছোটবেলা থেকেই নোটে মসজিদের ছবি দেখে অনেকের মনে জাগে এটি একবার কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকর্ষণেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কুসুম্বা ইউনিয়নের কুসুম্বা গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের মান্দা ব্রিজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত হওয়ায় সড়কপথে সহজেই এখানে যাওয়া যায়। মসজিদের চারপাশের সবুজ পরিবেশ ও বিশাল দিঘী দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।

বিশাল দিঘী ঘিরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ

মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের বিশাল একটি দিঘী। প্রায় ১২০০ ফুট দীর্ঘ ও ৯০০ ফুট প্রশস্ত এই জলাধার একসময় স্থানীয় মানুষ ও মুসল্লিদের পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বর্তমানে ঐতিহাসিক মসজিদের সঙ্গে বিশাল দিঘীটি পুরো এলাকার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুলতানি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

কুসুম্বা মসজিদের স্থাপত্যে ফুটে উঠেছে সুলতানি আমলের শিল্পরুচি। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫৮ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪২ ফুট বিস্তৃত মসজিদটির দেয়াল প্রায় ছয় ফুট পুরু। বাইরের দেয়াল পাথরে আবৃত হওয়ায় স্থাপনাটি পেয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

মসজিদের সামনের দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার। চার কোণায় রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির চারটি বুরুজ। ছাদের ওপর দুই সারিতে নির্মিত ছয়টি গম্বুজ প্রাচীন সুলতানি স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদের কয়েকটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থাপনাটির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা হয়।

পাথরের অলংকরণে ফুটে উঠেছে শিল্পীর নিপুণতা

মসজিদের অভ্যন্তরেও রয়েছে নানা নান্দনিক কারুকাজ। দুটি বিশাল পাথরের স্তম্ভ পুরো ছাদের ভার বহন করছে। পশ্চিম দেয়ালে থাকা তিনটি মেহরাবে ঝুলন্ত শিকল, ফুল ও লতাপাতার সূক্ষ্ম নকশা প্রাচীন শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

মসজিদের ভেতরে একসময় একটি দোতলা কক্ষ ছিল। স্থানীয়ভাবে এটি ‘জেনানা গ্যালারি’ বা নারীদের নামাজের স্থান হিসেবে পরিচিত। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর এই কক্ষটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

 

মসজিদের সামনে রয়েছে প্রশস্ত খোলা প্রাঙ্গণ। পাথর বসানো সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি দিঘীর দিকে নামা যায়। প্রবেশপথের কাছেই রয়েছে বাক্স আকৃতির একটি কালো পাথর, যা স্থাপনাটির প্রাচীনত্বের আরেকটি স্মারক।

নির্মাণকাল নিয়ে রয়েছে মতভেদ

কুসুম্বা মসজিদের নির্মাণকাল নিয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রধান শিলালিপির তথ্য অনুযায়ী, আফগান সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে ১৫৫৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

তবে অন্য একটি শিলালিপিতে ১৪৯৮ সালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়। এ কারণে মসজিদটির বয়স নিয়ে ৪৬৮ থেকে ৫২৮ বছরের মধ্যে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।

‘কুসুম্বা’ নামের পেছনে লোককথা

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বেগম কুসুম বিবির নাম থেকেই এলাকার নাম হয় কুসুম্বা। পরে সেই নাম অনুসারে মসজিদটির নামও কুসুম্বা মসজিদ হয়। তবে এই জনশ্রুতির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

পাঁচ টাকার নোটের ছবি: টানে দর্শনার্থীদের

কুসুম্বা মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। নওগাঁ শহরের পিএম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা হোসেন কৃপা বলেন, ‘পাঁচ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি দেখে অনেক দিন ধরেই এখানে আসার ইচ্ছা ছিল। সামনে থেকে দেখে খুব ভালো লাগছে। চারপাশের পরিবেশও সুন্দর। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সুবিধার জন্য এখানে একটি রেস্ট হাউস করা হলে ভালো হয়।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইরিন জামান বলেন, ‘ছবিতে মসজিদটি দেখেছি। তবে সামনে থেকে দেখার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। এত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ আগে দেখিনি। বিশাল দিঘী ও চারপাশের পরিবেশ মুগ্ধ করার মতো।’

নামাজে ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ

ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের পাশাপাশি প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরাও এখানে নামাজ আদায় করেন। বিশেষ করে শুক্রবার ও ঈদের জামাতে মসজিদের পুরো প্রাঙ্গণ মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায়।

 

মসজিদের খতিব মাওলানা মোস্তফা আল-আমিন বলেন, ‘মসজিদের ভেতরে চারটি কাতারে প্রায় ৮০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। এছাড়া সামনের খোলা প্রাঙ্গণে প্রায় ৭০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। রমজান মাসে এখানে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়।’

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাচীন এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কুসুম্বা মসজিদ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

 

ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা কুসুম্বা মসজিদ যেন অতীত আর বর্তমানের মধ্যে এক জীবন্ত সেতুবন্ধন। ধর্মীয় আবহ, প্রাচীন স্থাপত্য, পাথরের কারুকাজ, বিশাল দিঘী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে নওগাঁর এই স্থাপনাটি হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com