হরমুজ প্রণালীর তীরে ভারতীয় বণিকদের স্মৃতি, দেড় শতাব্দী পরও বহন করছে ভারত-ইরানের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র

ইরানে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক বিষ্ণু মন্দির

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে পারস্য সভ্যতা, ইসলামি স্থাপত্য এবং শিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাষ্ট্রের ছবি। কিন্তু সেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দির—বিষ্ণু মন্দির। পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী এই স্থাপনাটি ভারত ও ইরানের বহু পুরোনো বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক বিরল স্মারক।

 

ইরানের সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি কাজার (Qajar) আমলে, ১৩১০ হিজরি শামসি সালে নির্মিত হয়। প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি ১৮৯২ সালের কাছাকাছি। বন্দর আব্বাসে বসবাসকারী ভারতীয় হিন্দু বণিকদের ধর্মীয় উপাসনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

 

ঊনবিংশ শতকে বন্দর আব্বাস ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বাণিজ্য করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, সে সময় বন্দর আব্বাসসহ পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরে ভারতীয় বণিকদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।

 

সেই বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রয়োজন থেকেই মন্দিরটি গড়ে ওঠে। ২০২৬ সালে মন্দিরটি নতুন করে আলোচনায় আসে যখন ভারতের অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন বন্দর আব্বাসের এই প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

মন্দিরটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্য। ইরানের সরকারি পর্যটন ওয়েবসাইটের বর্ণনা অনুযায়ী, মন্দিরের কেন্দ্রীয় অংশ একটি আয়তাকার কক্ষ, যার ওপর রয়েছে গম্বুজ। এর স্থাপত্যে ভারতীয় মন্দিরশৈলীর পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থাপত্যের প্রভাবও রয়েছে।

 

নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রবাল পাথর, চুন, মাটি, মর্টার ও স্টুকো। মন্দিরের অভ্যন্তরের কিছু অংশে হিন্দু ধর্মীয় চিত্রকর্ম রয়েছে। বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণের চিত্র মন্দিরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

 

এই স্থাপত্য তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ভারতীয় উপমহাদেশের বণিকসমাজ এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন যোগাযোগের একটি দৃশ্যমান দলিল।

 

বন্দর আব্বাস হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের এই অঞ্চলে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও নাবিকদের আনাগোনা ছিল। ঐতিহাসিক নথিতে বন্দর আব্বাসকে বহু জাতি ও বণিকের মিলনস্থল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতীয় বণিকরাও এই বাণিজ্য নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

 

ফলে বন্দর আব্বাসের বিষ্ণু মন্দিরকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ ইতিহাস ধরা পড়ে না। এটি ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রাচীন বাণিজ্য, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও সাক্ষ্য বহন করে।

 

ইরান একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় ধর্ম হলো দ্বাদশী শিয়া ইসলাম। ইরানের সংবিধান খ্রিস্টান, ইহুদি ও জরথুস্ত্রবাদীদের স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে উল্লেখ করেছে। হিন্দু ধর্ম সেই সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত সংখ্যালঘু ধর্মগুলোর তালিকায় নেই।

 

তাই ইরানের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ শিয়া ও ৯ শতাংশ সুন্নি—এমন নির্দিষ্ট হিসাবকে বর্তমান নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ইরানের সরকারি জনগণনা অনুযায়ী ৯৯ শতাংশের বেশি বাসিন্দা নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন; তবে বিভিন্ন স্বাধীন জরিপে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

 

পিউয়ের ধর্মীয় জনসংখ্যা-সংক্রান্ত তথ্যেও ইরানে হিন্দুর সংখ্যা খুবই ছোট একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা যায়। ফলে বন্দর আব্বাসের এই মন্দিরের গুরুত্ব মূলত এর বর্তমান হিন্দু জনসংখ্যার আকারে নয়, বরং এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যে।

 

বন্দর আব্বাসের বিষ্ণু মন্দির যেন সময়ের একটি স্থিরচিত্র। একদিকে উনিশ শতকের ভারতীয় বণিকদের উপস্থিতি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ—দুইয়ের মিলন ঘটেছে এই স্থাপনায়।

 

মন্দিরটির অস্তিত্ব প্রমাণ করে, ভারত ও ইরানের সম্পর্ক শুধু আধুনিক কূটনীতি কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহু আগে থেকেই বাণিজ্যিক যোগাযোগের পাশাপাশি মানুষের চলাচল, ধর্মীয় চর্চা এবং স্থাপত্য-সংস্কৃতিরও আদান-প্রদান ছিল।

 

আজ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যখন আন্তর্জাতিক সংবাদে বারবার উঠে আসছে, তখন তার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির মনে করিয়ে দেয় আরেক ইতিহাস—সংঘাতের নয়, বরং বাণিজ্য, মানুষের যাতায়াত এবং সংস্কৃতির সংযোগের ইতিহাস।

 

প্রায় ১৩৪ বছর পরও বন্দর আব্বাসের এই মন্দির তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি ভারতীয় উপমহাদেশ ও পারস্যের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক অনন্য প্রতীক।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com