সোনার খনিতে দারিদ্র্যের বসবাস: কেমন আছে রূপকথা ও সংঘাতের দেশ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১১:০৫ এএম

সঞ্জয় মজুমদার, মধ্য আফ্রিকা:

বাঙ্গি, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র: ভৌগোলিক মানচিত্রে ঠিক আফ্রিকা মহাদেশের হৃদপিণ্ডে অবস্থিত একটি দেশ—মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (Central African Republic বা CAR)। বিশ্বরাজনীতিতে খুব একটা আলোচনায় না এলেও, এই দেশটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বিস্ময়, বৈপরীত্য আর এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। যার একদিকে চোখ জুড়ানো সবুজ প্রকৃতি আর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অফুরন্ত খনিজ সম্পদ, অন্যদিকে দশকের পর দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত।Resources এবং Ruin-এর এই অদ্ভুত সহবস্থান দেশটির মানুষের জীবনযাত্রাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।

নামের সার্থকতা বজায় রেখেই দেশটি পুরো আফ্রিকা মহাদেশের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। চারিদিকে স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত (Landlocked) এই দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান একে স্ট্র্যাটেজিক্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আবার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। দেশটির সীমান্তে রয়েছে ছয়টি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। উত্তর ও উত্তর-পূর্বে: চাদ এবং সুদান, পূর্বে: দক্ষিণ সুদান, দক্ষিণে: গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DRC) এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং পশ্চিমে ক্যামেরুন। ভৌগোলিক দিক থেকে দেশটি মূলত একটি বিশাল মালভূমি। এর উত্তর দিকটা শুষ্ক ও সাভানা মরুভূমির কাছাকাছি হলেও, দক্ষিণ অঞ্চল ঢেকে আছে আদিম ও ঘন রেইনফরেস্টে।

সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। দারিদ্র্য এখানে নিত্যসঙ্গী, এবং অবকাঠামোগত সুবিধা খুবই নগণ্য। তবে প্রতিকূলতার মাঝেও এ দেশের মানুষ অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও অতিথিপরায়ণ। এদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষিজাত পণ্যের ওপর ভিত্তি করে। প্রধান খাদ্য হলো 'কাসাভা' (এক ধরণের মূল জাতীয় শর্করা, অনেকটা মিষ্টি আলুর মতো)। এই কাসাভা পিষে রৌদ্রে শুকিয়ে তারা 'গোজো' (Gozo) নামের এক ধরণের ঘন মণ্ড তৈরি করে, যা মাংস বা মাছের ঝোলের সাথে প্রধান খাবার হিসেবে খাওয়া হয়। এছাড়া কলা (Plantains), চিনেবাদাম এবং বন্য জন্তুর মাংস (Bushmeat) এদের খাদ্য তালিকায় বেশ জনপ্রিয়। নানারকম লতাপাতা ও মশলা দিয়ে তৈরি স্টু বা ঝোল এদের খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এর মাটির নিচের সম্পদ। এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা মানের হীরা (Diamond) এবং সোনার (Gold) খনি। এছাড়া বিপুল পরিমাণে ইউরেনিয়াম এবং তেলের মজুদও রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই খনিজ সম্পদই দেশটির জন্য অশান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্পদ উত্তোলনের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় অবৈধভাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের খনিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই; সেগুলো বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দখলে। তারা সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক খনিতে কাজ করায় এবং চোরাচালানের মাধ্যমে এই মহামূল্যবান সম্পদ বিদেশে পাচার করে নিজেদের যুদ্ধের খরচ চালায়। ফলে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এই সম্পদের সুফল খুব কমই পৌঁছায়, আর সাধারণ মানুষ থেকে যায় নিঃস্ব।

খনিজ সম্পদে ধনী হওয়া সত্ত্বেও, মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। এখানকার সিংহভাগ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস আদিম পদ্ধতির কৃষিকাজ এবং ছোটখাটো ব্যবসা। খনিতে দিনমজুর হিসেবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও অনেকে জীবিকা নির্বাহ করে। ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে একটি বড় জনগোষ্ঠী জীবনধারণের জন্য পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

দেশের একটি বড় অংশ জুড়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত দুর্বল। এই শাসনতান্ত্রিক শূন্যতার সুযোগে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য 'আর্মড গ্রুপ' বা সশস্ত্র বিদ্রোহী দল। এদের মধ্যে প্রধান দুটি প্রতিপক্ষ হলো—প্রধানত মুসলিম বিদ্রোহী জোট 'সেলেকা' (Séléka) এবং তাদের দমনে গঠিত প্রধানত খ্রিস্টান ও অ্যানিমিস্ট মিলিশিয়া বাহিনী 'অ্যান্টি-বালাকা' (Anti-Balaka)। এই দলগুলো মূলত খনিজ খনি দখল, সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়া, অবৈধ কর আদায় এবং নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। এদের মধ্যকার ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতার কারণে দেশের লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে।

দেশের জাতীয় সেনাবাহিনীকে বলা হয় FACA (Forces Armées Centrafricaines)। অতীতে এই সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত দুর্বল, অসংগঠিত ও দুঃস্থ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপ (বর্তমানে আফ্রিকা কর্পস) এবং জাতিসংঘের স্থিতিশীলতা মিশন (MINUSCA)-এর শক্তিশালী সামরিক সহায়তায় ফাকা আর্মি এখন অনেক বেশি পেশাদার ও সুশৃঙ্খল। তারা বিদ্রোহীদের হটিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং কৌশলগত খনি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে এখনো পুরো দেশে শতভাগ শান্তি ও রাষ্ট্রীয় আইন ফিরিয়ে আনা তাদের জন্য মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।

এই দেশে 'ফুলানি' (Fulani) বা 'পেল' (Peul) সম্প্রদায়ের যাযাবর পশুপালকদের আনাগোনা প্রাচীনকাল থেকেই। তারা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে চাদ এবং সুদান সীমান্ত পেরিয়ে চারণভূমির খোঁজে হাজার হাজার গবাদি পশু নিয়ে এ দেশে প্রবেশ করে। এই যাযাবরদের বিশাল পশুর দল যখন স্থানীয় কৃষকদের ফসলের খেত মাড়িয়ে নষ্ট করে দেয়, তখন শুরু হয় সংঘাত। অনেক সময় এই যাযাবররা নিজেদের ও পশুর সুরক্ষায় সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাহায্য নেয়। কৃষকরাও পালটা আক্রমণ করে। এই পেশাগত দ্বন্দ্ব পরবর্তীতে বড় ধরণের জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

যোগাযোগের দিক থেকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে বললেই চলে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখানে প্রায় স্থবির। রাজধানী বাঙ্গি (Bangui)-র গুটি কয়েক রাস্তা ছাড়া পুরো দেশে পাকা রাস্তা নেই বললেই চলে। বর্ষাকালে (যা বছরের দীর্ঘ সময় থাকে) মাটির রাস্তাগুলো গভীর কাদায় পরিণত হয়, ফলে এক শহর থেকে অন্য শহরে ট্রাক বা যানবাহন যাতায়াত পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। চারদিকে স্থলবেষ্টিত হওয়ায় বাণিজ্যের জন্য তাদের প্রতিবেশী দেশ ক্যামেরুনের দুয়ালা (Douala) বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। বন্দর থেকে রাজধানী বাঙ্গিতে পণ্য আনতে ট্রাকগুলোকে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। নদীপথ (উবাঙ্গি নদী) যোগাযোগের একটি মাধ্যম হলেও তা সারা বছর নাব্যতা থাকে না এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মুখে থাকে।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এমন এক অভাগা দেশ, যার এক হাতে রয়েছে প্রকৃতির অপার দান—সোনা, হীরা, রেইনফরেস্ট, আর অন্য হাতে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধের গভীর ক্ষত। তবে ফাকা আর্মির সাম্প্রতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের শান্তির আকাঙ্ক্ষা দেশটিকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রা শুরু করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। হীরা আর সোনার এই দেশে একদিন বন্দুকের গর্জন থেমে যাবে এবং সম্পদ সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে—এটাই এখন বড় প্রত্যাশা।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com