৬০ হাজার বছর পেছনে থমকে যাওয়া মানবজাতি: তানজানিয়ার শিকারি জীবনের শেষ চিহ্ন -সংগ্রাহক ‘হাদজা’ উপজাতি

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি:

আধুনিক বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ অভিযান আর প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে ভাসছে, তখনো আফ্রিকার বুশল্যান্ডে হাজার হাজার বছর আগের আদিম জীবনধারা আঁকড়ে বেঁচে আছে এক অনন্য মানব সম্প্রদায়—‘হাদজা’ (Hadza)। তানজানিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত 'লেক এয়াসি' (Lake Eyasi) অববাহিকার শুষ্ক বনভূমিতে ছড়িয়ে রয়েছে এদের বসবাস। আধুনিক কোনো সুযোগ-সুবিধা, কৃষিকাজ কিংবা অর্থভিত্তিক অর্থনীতি স্পর্শ করতে পারেনি এদের। গবেষকদের মতে, প্রাক-কৃষিযুগের এই মানবগোষ্ঠী হলো মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত শিকড়।

 

জিনতাত্ত্বিক (Genetic) গবেষণায় দেখা গেছে, হাদজাদের ইতিহাস প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর পুরোনো। মানবজাতির সূচনালগ্নে আফ্রিকার প্রাক-ঐতিহাসিক মানুষ যেভাবে জীবন ধারণ করত, তারা আজও সেভাবেই রয়ে গেছে।

 

 এরা সম্পূর্ণ যাযাবর। পানির উৎস ও শিকারের প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে তারা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করে। মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে গাছের শুকানো ডালপালা ও লতাপাতা বাঁকিয়ে তারা ডিম্বাকৃতির কুঁড়েঘর তৈরি করে।

 

বর্ষাকালে তারা বড় বাওবাব (Baobab) গাছের প্রাকৃতিক গহ্বর কিংবা পাথরের গুহায় আশ্রয় নেয়।

 

হাদজাদের সমাজব্যবস্থা প্রথাগত যেকোনো সমাজের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং পুরোপুরি সাম্যবাদী।

 

এদের সমাজে কোনো রাজা, গোত্র প্রধান বা শাসক নেই। প্রথাগত অর্থে কেউ কাউকে নির্দেশ দেয় না।

 

খাবার বা সম্পদ জমিয়ে রাখার কোনো মানসিকতা এদের মধ্যে নেই। শিকার বা সংগৃহীত খাদ্য পুরো দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া হয়। ফলে সমাজে কোনো ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নেই।

হাদজাদের নিজস্ব ভাষাকে বলা হয় ‘হাদজানে’। এটি একটি বিশেষ বিচ্ছিন্ন ভাষা (Language Isolate)। কথা বলার সময় তারা জিভ দিয়ে একধরনের ‘ক্লিক’ (Clicking Sound) বা চোষা ধ্বনি তৈরি করে, যার সাথে পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার প্রত্যক্ষ মিল নেই।

পুরুষরা ছোটবেলা থেকেই কাঠের ধনুক ও পশুর রগ দিয়ে তীর তৈরি করতে শেখে। ‘ডেজার্ট রোজ’ নামের গাছ ফুটিয়ে তৈরি করা বিশেষ বিষ তীরের ফলায় মাখিয়ে তারা হরিণ, বাবুন বানর, হাইর্যাক্স বা পাখি শিকার করে। শিকারের সময় তারা পোষা কুকুরকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করে।

নারীরা জঙ্গল থেকে বুনো কন্দ, আলু, বাওবাব ফল ও বেরি জাতীয় ফল কুড়িয়ে আনে।

হাদজাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হলো বুনো মধু। মধু খুঁজতে তারা এক বিশেষ পাখির (Honeyguide bird) শিষের সংকেত অনুসরণ করে। পাখিটি মৌচাকের সন্ধান দিলে হাদজারা আগুন ও ধোঁয়ার সাহায্যে গাছে উঠে মধু সংগ্রহ করে এবং উপহার হিসেবে পাখিকে মৌচাকের মোম খেতে দেয়।

 হাদজা সমাজে কোনো কাগজের মুদ্রা বা ধাতব মুদ্রা নেই। সংগৃহীত মধুর বিনিময়ে তারা পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর কাছ থেকে ধাতব তীরের ফলা, ভুট্টার দানা কিংবা ব্যবহৃত টায়ার থেকে তৈরি বিশেষ জুতা সংগ্রহ করে।

 

হাদজাদের জীবনে কোনো ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, জন্মদিন বা বার্ষিক উৎসবের অস্তিত্ব নেই। এমনকি তাদের ভাষায় ‘এক’ এবং ‘দুই’ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশের শব্দ নেই। বয়স বা বছরের হিসাব রাখার প্রয়োজনও তারা কখনো বোধ করে না।

 

বর্তমানে হাদজা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা মাত্র ১,০০০ থেকে ১,৩০০ জনের মতো, যার মধ্যে কেবল ৪০০-৫০০ জন পুরোপুরি প্রথাগত জীবন ধরে রেখেছে। তবে আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনে তারা চরম সংকটে পড়েছে:

 

 গত ৫০ বছরে পার্শ্ববর্তী কৃষি ও গবাদিপশু পালনকারী গোত্রগুলোর জমি দখলের কারণে হাদজারা তাদের ঐতিহাসিক শিকার ভূমির প্রায় ৯০% অংশ হারিয়ে ফেলেছে।

বন উজাড় হওয়ার কারণে বুনো প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, ফলে শিকারিদের প্রায়ই অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।

বহিরাগতদের আগমন এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে তারা নানা ছোঁয়াচে রোগের সংস্পর্শে আসছে। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় শিশুমৃত্যুর হার অতিরিক্ত বেশি এবং এদের গড় আয়ু মাত্র ৩২ থেকে ৩৫ বছর।

 

প্রকৃতির সাথে পরম ভারসাম্যে বেঁচে থাকা এই জনগোষ্ঠী কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং মানব ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞানের এক অমূল্য জীবন্ত দলিল। প্রকৃতির সাম্যবাদের এই শেষ প্রতিনিধিদের যদি রক্ষা করা না যায়, তবে মানবজাতির নিজস্ব অতীতে ফিরে তাকানোর অন্যতম প্রধান জানালাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com