সুন্দরবন
সুন্দরবনের ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ জনের আত্মসমর্পণ
সুন্দরবনের ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ জনের আত্মসমর্পণ ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবনের সক্রিয় সব বনদস্যু নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ২৯ বনদস্যুকে আটক করা হয়। এ সময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্য এবং ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীসহ মোট ৩৭ জন সক্রিয় ডাকাত সদস্য ইতোমধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এ প্রেক্ষিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় বাগেরহাটের মোংলা থানাধীন সুন্দরবনের ধানসিদ্ধির চর এলাকায় ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়লসহ ১২ জন সক্রিয় ডাকাত সদস্য কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এ সময় তাদের কাছে থাকা ১টি এইট শুটার, ১টি সিক্স শুটার, ১টি ফোর শুটার, ১টি সাইড হেমার, ১টি বোল্ট অ্যাকশন পিস্তল, ২টি এমথ্রি গ্যাস গান, ২টি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ২টি ওয়ান শুটার, ২টি এয়ার গান, ২১২ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৯ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ২০ রাউন্ড ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল বল, ৫ রাউন্ড ৮ মি.মি. তাজা গোলা, ৪১৩ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ৪টি পিস্তল ম্যাগাজিন, ২টি এয়ারগান ম্যাগাজিন ও চার্জারসহ ৬টি ওয়াকিটকি কোস্ট গার্ডের নিকট জমা প্রদান করে। আত্মসমর্পণকারী ডাকাত জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমত (৩৬), সাইফুল্লাহ মোড়ল (৩৯), এখলাছুর রহমান (৩৮), রবিউল ইসলাম (৩৫), মফিজুল ইসলাম (৩৫), আজিম উদ্দিন গাজী (৩৭) ও আব্দুর রহমান শেখ (৩৬) খুলনা জেলার পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া থানার বাসিন্দা এবং শফিকুল ইসলাম (৫৩), মিন্টু গাজি (৩৯), আজিজুল গাজী (৩৫) ও শাহজাহান মালী (৩৫) সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার বাসিন্দা এবং আজিজুর রহমান (৪৫) বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার বাসিন্দা। নানা ভাই বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনে ডাকাতিসহ সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল। জব্দকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ পরবর্তী আইনানুগ কার্যব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন। সুন্দরবনের সব সক্রিয় বনদস্যুকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি। কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আত্মসমর্পণকারীদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে, যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুন্দরবন ধ্বংসের দায় ও বার্কলেস ব্যাংক: যুক্তরাজ্যের আদালতে ঐতিহাসিক অভিযোগ ও আইনি লড়াই
সুন্দরবন ধ্বংসের দায় ও বার্কলেস ব্যাংক: যুক্তরাজ্যের আদালতে ঐতিহাসিক অভিযোগ ও আইনি লড়াই ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিতর্কিত আর্থিক সহায়তার অভিযোগে ব্রিটিশ বহুজাতিক বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের দপ্তরে মামলা দায়ের করেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের পরিবেশকর্মীরা।.. বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের তিন অভিযোগকারী যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টের কাছে এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন খাতে এক নতুন আইনি নজির স্থাপন করেছে। অভিযোগকারীদের মূল দাবি হলো, বার্কলেস ব্যাংক এমন কিছু প্রকল্পের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ বজায় রেখেছে যা আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও মানবাধিকার নীতিমালা সরাসরি লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ডের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে ব্যাংকটি সুন্দরবনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের সহায়তায় দায়ের করা এই অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে বার্কলেস ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ছিল, যা প্রকারান্তরে বিতর্কিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছে। ভুক্তভোগী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান পশুর নদীর তীরে হওয়ায় এটি সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিলসহ অন্য অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন যে, প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে পশুর নদীর পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনের জলজ ও স্থলজ প্রাণীর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, বার্কলেস ব্যাংক বিনিয়োগের আগে পরিবেশগত প্রভাব বা মানবাধিকার ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন করেনি, যা একটি দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কাম্য ছিল না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যজীবীরাও এই অভিযোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা আজ এই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের কারণে অনিশ্চিত। তাদের ভাষ্যমতে, যখন বিশ্বের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রামপাল প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের এমন অর্থায়ন কেবল অনৈতিকই নয়, বরং পরিবেশগত অপরাধের শামিল। অভিযোগের বিপরীতে বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ব্রিটিশ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউনেসকোর পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করা ব্যাংকিং খাতের নৈতিকতার পরিপন্থী। ইউনেসকো ২০১৬ সালেই তাদের প্রতিবেদনে বায়ু ও পানিদূষণের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকাটি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়েছিল, যা বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের অজানা থাকার কথা নয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অভিযোগটি তদন্তের জন্য গ্রহণ করবে কি না, তা মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশবাদী আইনজীবীদের দাবি, এই তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়বদ্ধতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নের আগে তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। তারা আরও মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বাংলাদেশের বিশাল সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একমাত্র পথ। পরিশেষে, বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করার জন্য কেবল স্থানীয় আন্দোলনই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে থাকা আর্থিক মদদদাতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। এই মামলার রায় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে। যদি ব্যাংকগুলো পরিবেশের মূল্যের চেয়ে মুনাফাকে বড় করে দেখে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সুন্দরবনের মতো এলাকাগুলোর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে।
সুন্দরবনে ঢুকতে বনজীবিদের সংশয়
সুন্দরবনে ঢুকতে বনজীবিদের সংশয় ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ঋণগ্রস্ত জেলেদের মধ্যে জলদস্যু ও চাঁদাবাজদের কবলে পড়ার তীব্র আতঙ্ক কাজ করছে। দীর্ঘ তিন মাসের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন বনজীবী ও জেলেরা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বনের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, যা আজ মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদগুলোতে এখন নৌকা মেরামত, জাল বোনা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের যোগাড় নিয়ে চরম ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই জীবিকার পথ উন্মুক্ত হওয়ার আনন্দ ছাপিয়ে জেলেদের মনে ভর করেছে গভীর সংশয়। বন বিভাগ থেকে পাশ-পারমিট সংগ্রহের প্রস্তুতি চললেও, বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর নিজেদের নিরাপত্তা এবং উপার্জিত অর্থের সুরক্ষাকে ঘিরেই প্রধানত এই উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বনে প্রবেশ করা জেলেদের জন্য জলদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অবৈধ শিকারি চক্রের দৌরাত্ম্য এক বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জীবন নির্বাহের জন্য তাদের এনজিও এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন বনে প্রবেশ করলেই তাদের আয়ের একটি বড় অংশ জলদস্যুদের ‘স্লিপ’ বা টোকেন মানি হিসেবে চাঁদা দিতে হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানিয়েছেন যে, অতীতে প্রতি ১৫ দিনের যাত্রার জন্য নৌকাপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে দস্যুদের আগাম চাঁদা দিতে বাধ্য করা হতো। এছাড়া বনে দায়িত্বরত অসাধু বনকর্মীদের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারি চক্রের অবৈধ তৎপরতা বনজীবীদের নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এই চক্রগুলোর সাথে সংঘাতের ভয়ে অনেক জেলে বনে ফিরতে দ্বিধাবোধ করছেন, কারণ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের পর চাঁদা ও অবৈধ খরচের হিসাব মেলালে তাদের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. শামসুল আরেফীন জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনে জেলেদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে লোকালয়ে লুকিয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগীরা, যারা জেলেদের কাছ থেকে টোকেনের নামে চাঁদা আদায় করে, তাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহলের মাধ্যমে দস্যুদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা সম্ভব হবে। তবে বনজীবীদের মতে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বনের অভ্যন্তরে নিয়মিত টহল জোরদার এবং অসাধু চক্রের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে না দিলে তাদের আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়। সুন্দরবনকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি মূলত হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস। কিন্তু প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময়ে জলদস্যু ও চাঁদাবাজদের আধিপত্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা উপকূলীয় অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও চাঁদাবাজদের এই দুষ্টচক্র সক্রিয় থাকে, তবে বনজীবীরা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং বনের সামগ্রিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। আগামী কয়েক মাস জেলেদের জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা এখন প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের কঠোরতার ওপরই নির্ভর করছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হলে দস্যুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রাণচাঞ্চল্যে সুন্দরবন: ১ সেপ্টেম্বর থেকে সবারর জন্য উন্মুক্ত
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রাণচাঞ্চল্যে সুন্দরবন: ১ সেপ্টেম্বর থেকে সবারর জন্য উন্মুক্ত ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও বন উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বনের জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বিচরণ করবে। দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা ও কঠোর বিধিনিষেধ শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটক এবং বনজীবীদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে সুন্দরবন। গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছের প্রজনন ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধির সুবিধার্থে ম্যানগ্রোভ বনটিতে সকল ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ বিরতিতে মানুষের পদচারণা না থাকায় সুন্দরবন তার নিজস্ব ছন্দে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, এই তিন মাসে বনের গহীন অঞ্চলে হরিণের অবাধ বিচরণ, কুমিরের রোদ পোহানো এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে বনের পরিবেশ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত প্রাণবন্ত। বনের অভ্যন্তরে কৃত্রিম শব্দদূষণ ও মানুষের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সুন্দরী, গেওয়া ও গরান গাছের চারাগুলোও কোনো বাধা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে, যা বনের সামগ্রিক ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বন বিভাগের কার্যকর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের ফলে বনের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গত বছরের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৩৯টি মামলা দায়ের করেছে। এই সময়ে বন বিভাগ ৩৭ জন অপরাধীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি জালসহ ছয় হাজারেরও বেশি হরিণ শিকারি ফাঁদ জব্দ করেছে। এছাড়া বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের মতো ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিহত করতে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিষ ও বিষযুক্ত মাছ। জেলে ও বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও অসাধু চক্রের তৎপরতা দমনে বন বিভাগের এই কঠোর অবস্থান স্থানীয় বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বনের গভীরে যারা নিয়মিত কাজ করেন, তাদের মতে, এবারের নিষেধাজ্ঞা বন্যপ্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্রগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করেছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান বন বিভাগ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলোতেও নজরদারি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানোয় হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের মতে, বনের ইকোসিস্টেমের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী নীরবতা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় সুন্দরবন নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছে, যা বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা ২০২২ সাল থেকে মৎস্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তিন মাসব্যাপী কার্যকর করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে পর্যটন শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বন বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে যাতে বনের পরিবেশ আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বনজীবীদের পাস-পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মাবলি অনুসরণ করা হবে। সুন্দরবনের ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী ও ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণীর আবাসন নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বছরজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে তার সক্ষমতা অটুট রাখতে পারবে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বনের দরজা খোলার পর পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণই এখন বনের এই সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।
সুন্দরবনের কেওড়া ফল: উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
সুন্দরবনের কেওড়া ফল: উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা ম.ম.রবি রবি ডাকুয়াঃ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কেওড়া প্রাকৃতিকভাবে উপকূল রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সুন্দরবনের নদী-খাল ও লবণাক্ত চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কেওড়া গাছ বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সনেরাটিয়া অ্যাপেটালা বৈজ্ঞানিক নামের এই ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদটি মূলত বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ফল দেয়, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে কেবল একটি পরিচিত খাদ্য উপাদান নয় বরং জীবিকার একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর অনন্য শ্বাসমূল লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকতে বিশেষ সহায়তা করে। ফাগুনের শেষে ফুল আসার পর চৈত্র থেকে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত এই ফল সংগ্রহের উপযুক্ত সময়, যা উপকূলের প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় টক স্বাদের বৈচিত্র্য যোগ করার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। কেবল পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কেওড়া গাছের ভূমিকা এখন ক্রমবর্ধমান। দীর্ঘদিন ধরে উপকূলের মানুষের কাছে ঘরোয়া খাবার হিসেবে পরিচিত কেওড়া ফলকে কেন্দ্র করে এখন গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প। ফরিদা বেগমের মতো স্থানীয় নারীরা মৌসুমে কেওড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আচার ও চাটনি তৈরির মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সঙ্গে কেওড়া ফলের রান্না উপকূলীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী অংশ হলেও, বর্তমানে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় এনজিও কর্মীরা মনে করেন, যদি এই ফলটিকে যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করে দেশব্যাপী বাজারজাত করা সম্ভব হয়, তবে উপকূলীয় নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এই প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে ফলের মান নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক প্যাকেজিংয়ের অভাব এখনও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে, যা ভুক্তভোগী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপযোগিতা নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের গবেষণা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, এই ফলটি কেবল মানুষের খাদ্যই নয়, বরং চিত্রা হরিণ, বানর ও বিভিন্ন পাখির প্রধান খাদ্য উৎস হিসেবে বনের খাদ্যচক্র ও ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। এছাড়া বসন্তকালে কেওড়া ফুলে মৌমাছির ব্যাপক বিচরণ থাকায় সুন্দরবনের মধু উৎপাদনেও এই গাছটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা যে হারে বাড়ছে, তাতে ধানসহ প্রচলিত ফসল চাষ কঠিন হয়ে পড়ছে, যেখানে কেওড়া একটি অভিযোজিত ও সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে টিকে থাকার অনন্য ক্ষমতা প্রদর্শন করছে। ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কেওড়া গাছের পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও বনায়ন কার্যক্রমকে আরও বেগবান করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কেওড়া গাছ নদী ভাঙন রোধে ও চরভূমি স্থিতিশীল রাখতে যে ভূমিকা রাখে, তা উপকূলীয় কৃষি জমি ও বসতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের উচিত অবৈধভাবে কেওড়া গাছ কাটা রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় একে আরও উৎসাহিত করা। যদি এই বনজ সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে এটি কেবল উপকূলের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করবে না, বরং লবণাক্ত অনাবাদি জমিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করবে। সুন্দরবনের এই অনন্য ফলটিকে টিকিয়ে রাখার অর্থ হলো একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ও উপকূলীয় ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখা।
সুন্দরবনে অবমুক্ত বাঘিনীর রহস্যময় অন্তর্ধান: ৪০টি ক্যামেরায় মিলছে না অস্তিত্ব
সুন্দরবনে অবমুক্ত বাঘিনীর রহস্যময় অন্তর্ধান: ৪০টি ক্যামেরায় মিলছে না অস্তিত্ব ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ শিকারিদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার ও দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ অবস্থায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা বাঘিনীটি এক মাস পেরিয়ে গেলেও ট্র্যাপিং ক্যামেরায় ধরা না পড়ায় তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা ও ধোঁয়াশা।.. সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এলাকায় শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হওয়ার পর দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে গত ১২ জুলাই যে বাঘিনীটিকে বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, এক মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বন বিভাগ বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ওই এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকা জুড়ে প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপিং ক্যামেরা বসিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এতগুলো ক্যামেরার কোনোটিতেই বাঘিনীটির অস্তিত্ব বা চলাচলের কোনো ফুটেজ ধরা পড়েনি। দীর্ঘ সময় খাঁচাবন্দি ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাঘিনীটি বন্য পরিবেশে নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পেরেছে এবং সে আদৌ জীবিত আছে কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাঘিনীটির অবমুক্তির সময়কার শারীরিক দুর্বলতা ও ভারসাম্যহীনতা তার টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে, যা পুরো বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ভুক্তভোগী বাঘিনীটির এই অন্তর্ধানের পেছনে বনের বর্তমান পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং শিকারিদের তৎপরতাকেও বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অবমুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, খাঁচা থেকে বের হওয়ার সময় বাঘিনীটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে এবং বারবার পেছনের দিকে তাকাচ্ছে, যা তার মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে বন বিভাগ দাবি করছে, অবমুক্তির পর ১৫০ মিটার এলাকা জুড়ে বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল, যা তার প্রাথমিক বেঁচে থাকার প্রমাণ দেয়। তবে বর্তমানে সেই একই এলাকায় অন্য তিনটি বাঘিনীর বিচরণ রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই বাঘিনীটির জন্য একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় মানুষের সংস্পর্শে থাকার পর বন্য পরিবেশে ফিরে আসা একটি বাঘের জন্য অন্য বাঘের আধিপত্য বজায় থাকা এলাকায় টিকে থাকা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, যেখানে তার পুনরায় কোনো শিকারি বা চোরাকারবারির ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বন বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বাঘিনীটি মারা যায়নি বরং অন্য এলাকায় সরে গেছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, একটি বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে থাকে, ফলে বাঘিনীটি তার নিজের এলাকা পরিবর্তন করে ক্যামেরার আওতার বাইরে চলে যেতে পারে। বন বিভাগ আগামী সপ্তাহে আবারও এই ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করবে এবং এলাকাটিতে নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে। যদিও বন কর্মকর্তাদের এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না সচেতন মহল। চিকিৎসাধীন বাঘিনীটিকে এমন একটি এলাকায় অবমুক্ত করা হয়েছে যেখানে অন্য বাঘের উপস্থিতি আগেই নিশ্চিত ছিল, যা তার টিকে থাকার সম্ভাবনাকে আরও সংকীর্ণ করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বাঘিনীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের কৌশলগত ত্রুটি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। পরিশেষে, সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ইকোসিস্টেমে উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যে কতটা জটিল, এই ঘটনাটি তারই একটি বড় উদাহরণ। বাঘিনীটির এই রহস্যময় অন্তর্ধান কেবল একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার লড়াই নয়, বরং সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতার দিকেও ইঙ্গিত করে। যদি বাঘিনীটি জীবিত থেকে থাকে, তবে তার পরবর্তী অবস্থান নিশ্চিত করা এবং তাকে নিরাপদ করিডোরে ফিরিয়ে আনা বন বিভাগের জন্য এখন বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে, যদি সে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকে, তবে তা সুন্দরবনের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ছিদ্র থাকারই প্রমাণ দেয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও বনজ সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর জন্য এই ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ অনিবার্য করে তুলেছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসে সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের আহ্বান
সুন্দরবনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে বুধবার পালিত হয়েছে বিশ্ব বাঘ দিবস। ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বন বিভাগ ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দিবসটি উপলক্ষে বাঘ সংরক্ষণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সুন্দরবন অ্যাকাডেমিক ট্রাস্ট। বন বিভাগ সূত্রে জানায়, দিবসের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ এলাকায় স্থানীয় বন বিভাগের উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে বুধবার (২৯ জুলাই)। দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবুও চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে। তবে গত আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ-বাঘের সংঘাত কমেছে। এর ইতিবাচক ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে গত ১২ জুলাই সুস্থ হওয়া বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে। এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে। গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে একটি বাঘিনী কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে একটি বাঘকে নদী সাঁতরাতে দেখা যায়। বোটের শব্দ শুনে বাঘটি মাঝপথ থেকে ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সেই বিরল দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, নিজের এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এতো কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে। আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবাধে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে। পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে। বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণী সংরক্ষণ নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, তার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশকে টিকিয়ে রাখা। তাই বিশ্ব বাঘ দিবসে তাদের আহ্বান—চোরা শিকার ও পাচার বন্ধ, খাদ্যশৃঙ্খল সংরক্ষণ, বন ধ্বংস রোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিন দিনের ব্যবধানে এবার পূর্ব সুন্দরবনের নদীতে বাঘ সাতরাতে দেখলেন বনরক্ষীরা
তিন দিনের ব্যবধানে এবার পূর্ব সুন্দরবনের নদীতে বাঘ সাতরাতে দেখলেন বনরক্ষীরা। রবিবার (২৬ জুলাই) সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকার নদীতে সাঁতার কেটে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে নদীর অপর পাড়ে যেতে দেখেন তারা। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, রবিবার (২৬ জুলাই) দুপুরের দিকে চাঁদপাই রেঞ্জের স্মার্ট টীমের বনরক্ষীরা নিয়মিত টহলের সময় সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকার নদীতে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে সাঁতার কেটে নদী পার হতে দেখেন। বাঘটি সাতরে নদী পাড় হয়ে লাফিয়ে সুন্দরবনে উঠে বনের মধ্যে চলে যায়। বনরক্ষীরা বাঘ সাতরানোর বিরল এ দৃশ্যটির ভিডিও ধারণ করেছেন। এর আগে, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের অফিস আঙ্গিনায় একটি বাঘিনী এসে প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থান নিয়ে আপন মনে ঘোরাঘুরি করে আবার সুন্দরবনের মধ্যে চলে যায়। তিনি আরো বলেন, টহলের সময় সচরাচর বাঘ দেখা যায় না। সুন্দরবনে এখন বনজীবী, পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সুন্দরবনে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী সাচ্ছন্দে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বন অপরাধ কমে এসেছে। সুন্দরবনে আগের তুলনায় বাঘ ও হরিণের সংখ্যা বেড়েছে বলে ডিএফও জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ,অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জিম্মি জেলে উদ্ধার
সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ; উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জিম্মি জেলে। বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) সকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান। সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় সকল বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। উক্ত অভিযানের প্রেক্ষিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হতে অদ্যাবধি ৪৯ টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ৩১৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১০৮ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা ও ২টি ওয়াকি-টকি উদ্ধার এবং ৪২ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়। এসময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনী তার সহযোগীসহ সর্বমোট ৭ জন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্য দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষিতে, গত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখ বুধবার বিকাল ৫ টায় বাগেরহাটের শরনখোলা থানাধীন সুন্দরবনের তাম্বুলবুনিয়া ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন কলামুলি খাল এলাকায় ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ জন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ড এর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এসময় তাদের কাছে থাকা ২ টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১ টি দেশীয় পাইপগান, ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ১টি ওয়াকিটকি কোস্ট গার্ড এর নিকট জমা প্রদান করে। এছাড়াও উক্ত সময় ডাকাত সদস্যদের নিকট হতে জিম্মি থাকা ১ জন জেলেকে উদ্ধার করা হয়। আত্মসমর্পণকারী ডাকাত আলামিন হোসেন (৪০) বাগেরহাট জেলার মোংলা থানা, তৈবুর রহমান (২৪) সাতক্ষীরা জেলার তালা থানা এবং মনিরুজ্জামান মামুন (২০) খুলনার জেলার কয়রা থানার বাসিন্দা। বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনে ডাকাতিসহ সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল। জব্দকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ পরবর্তী আইনানুগ কার্যব্যবস্থা গ্রহণ এবং উদ্ধারকৃত জেলেকে পরিবারের নিকট হস্তান্তরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এর নিরলস অভিযান এবং কঠোর অবস্থানের কারণেই সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো অনেকাংশে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সুন্দরবনের সকল সক্রিয় ডাকাতদের দস্যুবৃত্তি পরিহার করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এর নিকট আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে ইচ্ছুক, আত্মসমর্পণের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান করা হবে। অন্যথায়, যারা আত্মসমর্পণ না করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত “জিরো টলারেন্স” নীতির আলোকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ভবিষ্যতে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একইসাথে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। সরকারের নির্দেশনা, আপনাদের সকলের সহযোগিতা এবং অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
সুন্দরবনে বনরক্ষীর অভিযানে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই জব্দ
পূর্ব সুন্দরবনের চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির শিয়ালা এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে বনরক্ষীরা অভিযান চালিয়ে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই জব্দ করেছেন। এ সময় জেলেরা সুন্দরবনে পালিয়ে যায়। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পূর্ব সুন্দরবনের চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীরা বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে নিয়মিত টহল কালে সুন্দরবনের শিয়ালা এলাকার সাইডখালে তিনটি জেলে নৌকা দেখতে পেয়ে এগিয়ে যায়। বনরক্ষীদের দেখতে পেয়ে নৌকা আরোহী অজ্ঞাত পরিচয়ের জেলেরা নৌকা ফেলে সুন্দরবনের মধ্যে পালিয়ে যায়। পরে বনরক্ষীরা নৌকায় তল্লাশী করে ২৪ বোতল কীটনাশক, তিনটি টোনা জাল ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই এবং অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করেন। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে বনরক্ষীরা সুন্দরবনে বিষদস্যুদের একটি অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। অজ্ঞাত পরিচয়ের জেলেরা সুন্দরবনের খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরে বনের মধ্যে মাছ শুঁটকি করার জন্য সরঞ্জাম নিয়ে অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। এমনিতে এখন সুন্দরবনে মাছ ধরায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা জারী রয়েছে বলে এসিএফ জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম রক্ষায় শ্যামনগরে ‘লংমার্চ ফর ফরেস্ট’ কর্মসূচি
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া রক্ষা এবং নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ‘লংমার্চ ফর ফরেস্ট’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ৩০ জুন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রীন কোয়ালিশন ও শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠন দুটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে উপজেলার নীলডুমুর এলাকা থেকে শুরু হয়ে লংমার্চটি বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। এতে নেতৃত্ব দেন গ্রীন কোয়ালিশন জেলা সভাপতি আবু আফফান রোজ বাবু এবং শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুদ্দিন সিদ্দীকি। লংমার্চ শেষে আন্দোলনকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বক্তারা বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি সাধারণ বন নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি প্রাকৃতিক আশ্রয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় এই বন সবসময় ঢাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্মারকলিপিতে আন্দোলনকারীরা উল্লেখ করেন, সুন্দরবনের নদীতে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা বনজ বীজগুলো মূলত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে। তবে শ্যামনগর উপজেলার নদীবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন নদী থেকে ভেসে আসা এসব বনজ ফল ও বীজ সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। নির্বিচারে এই বীজ সংগ্রহের ফলে প্রাকৃতিকভাবে নতুন গাছ জন্মানোর সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, যা সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মকে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি বীজের স্বাভাবিক বিকাশ বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি গাছের ক্ষতি নয়, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে বনপ্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সংকট উত্তরণে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ অবিলম্বে বন্ধ করা; বন টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা, সিপিজি, ডিসিটি, ভিটিআরটি ও ভিসিএফ সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি করা; জনসচেতনতা তৈরিতে আলোচনা সভা, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং কার্যক্রম চালু রাখা এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ ও যুব সমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। উক্ত কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সাতক্ষীরা নিজস্ব প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জী, ডিবিসি নিউজের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি এম বেলাল হোসাইন, মানবজমিনের শ্যামনগর প্রতিনিধি জাহিদ সুমন, আমাদের সময়ের শ্যামনগর প্রতিনিধি বেলাল হোসেন, পত্রদুতের উপকূলীয় প্রতিনিধি আব্দুল হালিম, বনজীবী নারী নেত্রী শেফালী বিবি, ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহীন ইসলাম, স ম ওসমান গনী ও জান্নাতুল নাঈমসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।