পাট
টানা অতিবৃষ্টিতে কমেছে পাটের ফলন, ভালো দামে খুশি পাঁচবিবির পাট চাষিরা
লাভের আশায় চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ১ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে পাট চাষাবাদ করেছেন কৃষকেরা। তবে মৌসুমের শুরু থেকে টানা বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক জমিতে পাটগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। এতে গত বছরের তুলনায় এবার আঁশের ফলন কিছুটা কমার আশঙ্কা করছেন এ উপজেলার কৃষকেরা। তবে বাজারে পাটের দাম ভালো থাকায় ফলন কম হলেও কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন তারা। পাঁচবিবি বাজারে বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ দাম কিছুটা স্বস্তি দিলেও ফলন কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। উপজেলার কুসুম্বা, আটাপুর, বালিঘাটা ও ধরঞ্জী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে পাটগাছ আশানুরূপ লম্বা ও সবল হয়নি। কোথাও কোথাও দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রতি বিঘায় পাটের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। উপজেলার ধরঞ্জী ইউনিয়নের উচনা গ্রামের পাটচাষি শাহাদাত হোসেন ও আরিফুল ইসলাম বলেন, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, আগাছা পরিষ্কার, নিড়ানি, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোসহ বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ হয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তাই ফলন কমে গেলে ভালো বাজারদর পেয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভ করা কঠিন হবে। তবে এবার খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় পাট জাগ দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আটাপুর ইউনিয়নের বেতগাড়ী গ্রামের পাটচাষি মহাদেব সিং বলেন, গত বছর পাটের ভালো দাম পেয়েছিলাম। তাই এবারও এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে গাছ তেমন বাড়েনি। ফলন কম হলে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। ৬ থেকে ৭ মণ বিঘাপ্রতি পাট হয়েছে। উপজেলার বালিঘাটা ইউনিয়নের বীরনগর গ্রামের পাটচাষি লিটন মন্ডল বলেন, পাটের দাম ভালো থাকলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে। কিন্তু এবার গাছ ছোট হওয়ায় আঁশ কম পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন কম হওয়ায় লাভও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের বেলপুকুর গ্রামের পাটচাষি রায়হান বলেন, “দুই দিন আগে পাট কেটেছি। এখন জাগ দিচ্ছি। এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে সব মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে বাজারে এবার পাটের দাম ভালো থাকায় কিছুটা আশাবাদী। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হলে বাজারে নতুন পাটের সরবরাহ বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকেরা বলছেন, ফলন কম হওয়ায় বাজারে পাটের দাম ভালো থাকলে তাদের সম্ভাব্য লোকসান কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। কৃষকদের দাবি, পাটের উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় সরকারিভাবে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্য দামে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা আরও বেশি লাভবান হবেন। পাঁচবিবি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ১ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উপজেলার অনেক এলাকায় পাটের ফলন সন্তোষজনক হওয়ার আশা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকেরা পাটের ভালো দাম পেয়ে উৎপাদনজনিত ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন।
বকশীগঞ্জে পাটের বাম্পার ফলন, ভালো দামের আশায় কৃষক
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের ভালো ফলন হওয়ায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত, কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ এবং কৃষকদের পরিচর্যার ফলে এবার পাটের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুরোদমে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ সংগ্রহের কাজ চলছে। তবে উৎপাদন ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর আরও কিছুটা বাড়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। উপজেলার নিলক্ষিয়া, মেরুরচর, বাট্টাজোড়, বগারচর ও ধানুয়াকামালপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এবার পাটের আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মোট ১ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১ হাজার ২৭০ হেক্টর জমির পাট কাটা সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৬০৫ হেক্টর জমির পাট কাটার কাজ চলমান রয়েছে। এ মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও কৃষকরা পাট কাটছেন, কোথাও আঁটি বেঁধে খাল-বিল ও জলাশয়ে জাগ দিচ্ছেন, আবার কোথাও আঁশ ছাড়িয়ে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভালো ফলনের কারণে কৃষকদের মুখে স্বস্তির হাসি থাকলেও বাজারদর নিয়ে রয়েছে কিছুটা উদ্বেগ। নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, “এ বছর পাটের ফলন খুব ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রোগবালাইও তেমন ছিল না। তবে সার, শ্রমিক ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে যে দামে পাট বিক্রি হচ্ছে, তাতে খরচ উঠে এলেও দাম আরও কিছুটা বাড়লে কৃষকরা বেশি লাভবান হতেন।” বগারচর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আওয়াল বলেন, “পাট চাষে পরিশ্রম অনেক বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম আরও কিছুটা বাড়লে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, “চলতি মৌসুমে বকশীগঞ্জে পাটের আবাদ ও ফলন দুটিই সন্তোষজনক। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অবশিষ্ট জমির পাটও সফলভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরও বাড়বে।” বর্তমানে বকশীগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় দাম আরও কিছুটা বাড়লে তারা ন্যায্য লাভ পাবেন। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পাট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল এবং পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে বকশীগঞ্জে পাট চাষের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে, যা কৃষকের আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।