শিকলে বন্দি শফিকুলের ৪০টি বছর! ঠাই হয়নি পাকা বাড়িতে
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
হাসানুজ্জামান হাসান,লালমনিরহাট:
বাড়ির বাহিরের উঠানের এক কোনায় বারান্দায় পায়ে শিকল বাঁধা বৃদ্ধ শফিকুল ইসলাম(৮০)। এভাবেই ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেটে যাচ্ছে ৪০ বছর। এলকার সম্পদশালীদের অন্যমত হয়েও এ বৃদ্ধের ঠাঁই হয়নি পাকা বাড়ির কোন এক কোনায়।
বৃদ্ধ শফিকুল ইসলাম লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর গ্রামের বাসিন্দা। উত্তর বালাপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের পাকা বাড়িটি বৃদ্ধ শফিকুলের স্ত্রী সন্তানরা বসবাস করেন। তার ঠাঁই হয়েছে সেই বাড়ি বাহিরের উঠানের ৫০ গজ দুরে বাঁশ বাগানের নিচে গুদামের বারান্দায়।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, যৌবন বয়সে তেজদৃপ্ত শফিকুল ইসলাম স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন। কাক ডাকা ভোরে কোদাল কাস্তে আর গরু বাছুর নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন নিজের জমিতে। হালচাষ করে চলত তার সংসার। ফসল দিয়ে প্রতি বছর জমি ক্রয় করে জমি করেছেন প্রায় ২৫ দোন(২৭ শতাংশে দোন)। দুই ছেলে দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। তার বড় মেয়ে রেহানা বেগম চন্দ্রপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য। যৌবনের শেষ দিকে হঠাৎ পারিবারিক চাপে মানসিক ভারসাম্য হারান শফিকুল ইসলাম। প্রথম দিকে কবিরাজের মাধ্যমে তাবিজ কবজের চিকিৎসা করায় পরিবার। কিন্তু উন্নতি না হয়ে দিন দিন অবনতি হতে থাকে।
মানসিক ভারসাম্যহীন পরিচয় মিলে এক সময়ের তেজদৃপ্ত যুবক শফিকুলের। নামের সাথে যুক্ত হয় শফিকুল পাগলা। পাগলের জমি বিক্রি অসম্ভব হেতু চিকিৎসাও চলে ধিরগতিতে। জমি বিক্রি না হলেও বন্দক রেখে শফিকুলকে পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে। পাবনা মানসিক হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসার পরে সেখানে অবনতি ঘটলে তাকে বাড়ি পাঠান চিকিৎসকরা।
সেই থেকে পায়ে শিকল পড়ে বাড়ির উঠানের এক কোনায় গুদাম ঘরের উন্মুক্ত বারান্দায় বেঁধে রাখা হয়। সেখানে একটা কাঠের চৌকিতে বসেই কেটে যাচ্ছে ৪০ বছর। সেই বারান্দায় থাকা খাওয়া শৌচকাজ সব সাড়তে হচ্ছে এ বৃদ্ধকে। বিড় বিড় করে একাই কথা বলেন। কেউ গেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। শিকল খুলে দেয়ার আকুতি জানালেও কেউ খুলে দেয় না। খুলে দিলেই হারিয়ে যাবে অথবা প্রতিবেশীদের আঘাত করবে ক্ষতি করবে। সপ্তাহে একদিন বড় ছেলে মাহবুবুর রহমান বৃদ্ধ বাবাকে গোসল করান, বারান্দার মলমুত্র পরিস্কার করে দেন। বড় ছেলে ব্যাতিত কেউ ভিড়েন না শফিকুলের কাছে। স্ত্রী মালেকা বেগমকে দেখলেই রেগে তেড়ে উঠেন। যার কারন কেউ জানেন না।
পেটে ক্ষুধা পেলে চিৎকার করে তখন বড় ছেলে খাবার নিয়ে সামনে দিলে নিরবে খেয়ে নেন বৃদ্ধ শফিকুল। নেই মশারী বা মশার কয়েল, নেই ভাল বিছানা কিংবা ফ্যান। শীত কুয়াশা রোদ বৃষ্টি কিংবা ঝড়। সকল প্রতিকুল পরিবেশে থেকেও সর্দ্দি জ্বর টুকুও নেই বৃদ্ধ শফিকুলের। ভাংচুর করে আঘাত করে তাই দুই ছেলে আর স্ত্রীর পাকা বাড়ির কোন কক্ষেও জায়গা হয়নি তার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শফিকুলের এক বাল্যবন্ধু বলেন, কিশোর থেকে যৌবন বয়সে প্রচন্ড রকমের পরিশ্রমী আর সাহসী ছিলেন শফিকুল। ৪০ বছর আগে হঠাৎ কি যে হলো? মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হলেন। মানুষের ক্ষতি করা শুরু করলেন। তখন থেকে তাকে শিকল বন্দি করা হয়েছে। সম্ভবত পারিবারিক চাপে এমনটা হয়েছেন। তবে তার সম্পদ বলতে জমিগুলো। সে জমিও তো বিক্রি করতে পারছে না পরিবার। যার কারনে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অসুস্থতা বেড়েছে। পুরুষের সুখ শান্তি পরিবারে। তার ব্যতয় ঘটলে মানসিক রোগী। কঠোর পরিশ্রম করে সম্পদ করলেও তার চিকিৎসায় সেই সম্পদ কাজে লাগছে না। তাকে দেখলে বেশ মায়া হয়, যোগ করেন শফিকুলের বাল্যবন্ধু।
শফিকুলের স্ত্রী মালেকা বেগম বলেন, প্রায় ৩৮/৪০ বছর আগে হঠাৎ মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। প্রথম দিকে কবিরাজের চিকিৎসা করেছি ভাল হয়নি। পরে জমি বন্দক রেখে রংপুর পাবনায় চিকিৎসা করানো হলেও কোন উন্নতি হয়নি। পরে চিকিৎসা বাদ দিয়ে এখানে শিকলে বেঁধে রেখেছি। ক্ষিদে পেলে চিৎকার করে তখন বড় ছেলে খাবার দেয়। মাঝে মধ্যে গোসল করানো হয়। জায়গাটা পায়খানা প্রসাবে দুর্গন্ধ উঠে মাঝে মধ্যে বড় ছেলেই পরিস্কার করে দেয়। বড় ছেলে গেলে কিছু করে না। আমি বা অন্য কেউ গেলে ক্ষতি করতে তেড়ে উঠে। মশারী, কয়েল বা ফ্যান দিলে ভেঙে ফেলে তাই দেয়া হয়না। তবুও তার সর্দ্দি জ্বর পর্যন্ত নেই। স্বামীর কষ্ট দেখে খারাপ লাগলেও বাড়িতে নেয়ার মত পরিবেশ নেই। বাড়ি নোংরা করে ফেলে।
শফিকুলের বড় মেয়ে ইউপি সদস্য রেহানা বেগম বলেন, আমার জন্মের ৫ বছর পরে বাবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। সেই থেকে তিনি শিকলবন্দি। ঘরে রাখলে ঘর নষ্ট করে, মশারী বা গরম কাপড় দিলেও তা ছিড়ে ফেলে। তাই বারান্দায় রাখা হয়েছে। জমি অনেক থাকলেও তা বিক্রির সুযোগ না থাকায় টাকার অভাবে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় নি। বাবা কষ্টে পড়ে থাকেন দেখে মায়া লাগলেও কিছু করার নেই।
চন্দ্রপুর ইউপি সদস্য আমির হামজা বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি তিনি শিকল বন্দি। ছেড়ে দিলে হারিয়ে যায় তাই বেঁধে রেখেছে পরিবার। এটা অমানবিক হলেও কিছু করার নেই তার পরিবারের। তবে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থতার ব্যবস্থার করা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।