মহৎ প্রাণের মানুষ, শিক্ষানুরাগী জগদীশ চন্দ্র মজুমদার (ঝড়ু সাধু)

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

বিশেষ প্রতিবেদন: সঞ্জয় মজুমদার।

"শিক্ষা আলোর বর্তিকা, আর সেই আলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কিছু মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। এমনই এক মহৎ প্রাণ, বীর সৈনিক ও চিকিৎসাসেবী ব্যক্তিত্ব—জগদীশ চন্দ্র মজুমদার।"

 

জগদীশ চন্দ্র মজুমদার ছিলেন একাধারে একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক, মানবসেবী নিরাময়ক এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী। সমাজ সংস্কার, জনকল্যাণ এবং শিক্ষার প্রসারে তাঁর অনন্য অবদান আজও ধামরাই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

 

তিনি ১৯১৩ সালে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার অন্তর্গত 'সীতি' গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন (ডাকঘর: বাড়িগাও)।

 

 পিতা: হর চন্দ্র মজুমদার মাতা: সখী সুন্দরী দ্যাস্যা, সহধর্মিণী: মিষ্ঠরানী মজুমদার সন্তান: উপনিত্য মজুমদার, গৌরাঙ্গ মজুমদার ও রামপ্রসাদ মজুমদার

 এলাকা ও দূর-দূরান্তে তিনি অত্যন্ত ভক্তিভরে 'ঝড়ু সাধু' হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন।

 

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি এক কঠিন আদর্শিক ও নৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে হতে পারে—এই গভীর মানবিক উপলব্ধি থেকে তিনি সৈনিকের সুনিশ্চিত ক্যারিয়ার ত্যাগ করে ইস্তফা দেন এবং নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এই সিদ্ধান্তটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে তিনি অনুধাবন করেন—একটি উন্নত, বিবেকবান ও সুশিক্ষিত সমাজ গঠনে প্রাথমিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কোমলমতি শিশুদের আলোর দিশারী করতে ১৯৪২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'সীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'। বিদ্যালয়ের স্থায়ী অবকাঠামো তৈরির জন্য তিনি নিজের ৩৫ শতাংশ জমি নিঃশ্বার্থভাবে দান করে মহানুভবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর এই ত্যাগের ফলেই আজ হাজারো শিশু শিক্ষার আলো পাচ্ছে এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে।

 

পরবর্তী জীবনে তিনি সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। সন্ন্যাসী জীবনে তিনি কেবল ধ্যানে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং ভেষজ ও আধ্যাত্মিক উপায়ে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন। একজন 'সাধু' বা সেবক হিসেবে মানুষের রোগমুক্তি ও সেবাতেই তিনি পরম আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন।

শিক্ষার প্রতি অনুরাগী: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিজ স্বার্থ ভুলে শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। মহানুভবতা ও ত্যাগের স্মারক হিসেবে বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করে ধামরাইয়ে সমাজসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়েছেন।

 

 মানবসেবায় নিবেদিত চিকিৎসাসেবা ও এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

 

জীবনাবসান ও অমর স্মৃতিতে দীর্ঘ ৯১ বছরের এক মহিমাম্বিত ও নিবেদিত জীবন অতিবাহিত করার পর ২০০৪ সালে এই অনন্য ব্যক্তিত্ব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

 

সীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে জড়িয়ে আছে তাঁর স্বপ্ন ও স্মৃতি। আজ বিদ্যালয়টি যে শত শত আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে চলেছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এই মহান দানবীরের অবদান। জগদীশ চন্দ্র মজুমদার (ঝড়ু সাধু) তাঁর কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর সাফল্য ও শত শত মানুষের হৃদয়ে। আমরা এই মহৎ প্রাণের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com