জন্মেই আঁকা ভাগ্যের সিলমোহর: হরিজনদের জীবন কি শুধু গ্লানির বোঝা?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম

বিশেষ প্রতিবেদন: সঞ্জয় মজুমদার

ভোরের আলো ফোটার আগেই নিস্তব্ধ শহরের রাস্তায় নেমে আসে কিছু ছায়ামূর্তি। ঝাড়ুর খসখস শব্দে জেগে ওঠে নগরী। নর্দমার দুর্গন্ধ আর বর্জ্যের স্তূপ সরিয়ে তারা প্রস্তুত করে আমাদের একটি পরিচ্ছন্ন দিন। শত রোগবালাই ও শারীরিক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে যে মানুষগুলো নিভৃতে এই শহরকে করে তোলেন বসবাসযোগ্য, দিনশেষে তারাই পড়ে থাকেন চরম অবহেলা ও সামাজিক গ্লানির অন্ধকারে। বাংলাদেশে বংশপরম্পরায় এই অমানসিক শ্রম দিয়েও সমাজের ন্যূনতম স্বীকৃতিটুকু পাননি হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষজন।

উপমহাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলের শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আনা হয়েছিল তাদের। শত বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের একচুলও পরিবর্তন হয়নি। জন্মসূত্রে পাওয়া পেশার এই সিলমোহরটিই যেন তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক চিরস্থায়ী সামাজিক অভিশাপ হয়ে।

শহরের এক কোণে নির্দিষ্ট 'হরিজন কলোনি'র একচিলতে জায়গায় গাদাগাদি করে তাদের দিনযাপন। খোলা ড্রেন, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর দুর্গন্ধের সাথেই কেটে যায় শৈশব থেকে বার্ধক্য। নিজেদের কোনো জমি বা স্থাবর সম্পত্তি নেই; সরকারি বা সিটি কর্পোরেশনের কোয়ার্টারের কলোনিতেই বন্দি তাদের পুরো জীবন।

কলোনির গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে বের হলেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় তীব্র সামাজিক বয়কটের:

সাধারণ রেস্তোরাঁয় ঢুকলে তাদের ভেতরে বসতে দেওয়া হয় না; বাইরে দাঁড়িয়ে আলাদা পাত্রে বা পলিথিনে খাবার নিতে হয়। সেলুন থেকে শুরু করে সাধারণ দোকানপাটে এখনও তাদের 'অন্য চোখে' দেখা হয়। বাসে বা অন্য কোনো যানবাহনে উঠলে তাদের পাশ থেকে সরে যান অনেক যাত্রী।

হরিজনদের নতুন প্রজন্ম প্রতিদিন এই অনিশ্চয়তা আর বৈষম্যের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সামাজিক কুসংস্কার ও মানসিকতা সেই স্বপ্নকে শুরুতেই পিষে ফেলে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরিজন শিশুদের সহপাঠী ও শিক্ষকদের একাংশের চরম অনীহা ও বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হয়। মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে অকালেই ঝরে পড়ে অধিকাংশ শিশু।

 কলোনির এক তরুণ বিএ শিক্ষার্থী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলছিলেন—

"আমরা পড়াশোনা করলেও কি অন্য কোনো চাকরি পাব? ইন্টারভিউ দিতে গেলে পরিচয় শুনেই তো অনেকে মুখ বাঁকায়। আমাদের জন্য নাকি একটাই কাজ বরাদ্দ—ময়লা পরিষ্কার করা। তাই পড়ালেখা শেষ করার আগেই আমাদের সেই ঝাড়ু হাতে তুলে নিতে হয়।"

ফলে বিকল্প পেশায় যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে চরম হতাশায় ডুবছে তরুণ প্রজন্ম এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও পূর্বপুরুষের এই কায়িক পরিশ্রমকেই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী (গ্লাভস, গামবুট, মাস্ক) ছাড়াই খালি হাতে বিষাক্ত বর্জ্য ও মরণফাঁদ ম্যানহোল পরিষ্কার করতে হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। বিষাক্ত গ্যাসে ম্যানহোলের ভেতরেই অকালে প্রাণ হারান অনেকে। চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা ও গ্যাংগ্রিনের মতো জটিল ব্যাধি তাদের নিত্যসঙ্গী। এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নেই কোনো সরকারি চিকিৎসা ভাতা বা জীবন বীমা। অল্প বয়সে পঙ্গুত্ব বা অকালমৃত্যু বরণ করাই যেন তাদের নিয়তি।

পার্বত্য ৩টি জেলা (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) ছাড়া দেশের প্রায় সব জেলা, সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা এলাকাতেই তাদের বসবাস। বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের তথ্য মতে, সারা দেশে প্রায় ১২৪টিরও বেশি সংগঠিত হরিজন বা সুইপার কলোনি রয়েছে।

ঢাকা বিভাগ- বংশাল (হরিজন কলোনি), মিরপুর, ধোলাইখাল, ধোলাইপাড়, সায়েদাবাদ, গণকটুলী (হাজারীবাগ) ও আজিমপুর কলোনি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ফরিদপুর পৌর কলোনি।

চট্টগ্রাম বিভাগ- ফিরিঙ্গি বাজার, টাইগার পাস, মাদারবাড়ী ও নিউমার্কেট সংলগ্ন হরিজন পল্লী। এছাড়া কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চাঁদপুর পৌরসভার সেবক নিবাস।

সিলেট বিভাগ- কাষ্টঘর (সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় কলোনিগুলোর একটি), শেখঘাট এবং বিভিন্ন চা বাগান সংলগ্ন এলাকা।

রংপুর ও রাজশাহী- রংপুর পৌরসভা কলোনি, দিনাজপুর, গাইবান্ধা (মহিমাগঞ্জ ও গোবیندগঞ্জ)। রাজশাহী শহরের হেতেম খাঁ ও ভদ্রা কলোনি।

খুলনা ও বরিশাল- যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা সিটি কর্পোরেশন এলাকা, বাগেরহাট এবং বরিশাল সদর এলাকার সেবক কলোনিসমূহ।

হরিজন সম্প্রদায়ের এই করুণ অবস্থা কেবল তাদের একার সংকট নয়, এটি আমাদের কথিত সভ্য সমাজের এক চরম নৈতিক ব্যর্থতা। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি:

কলোনির স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা পরিবেশ থেকে বের করে তাদের জন্য মানবিক ও স্বাস্থ্যকর আবাসন নিশ্চিত করা। হরিজন শিশুদের বিদ্যালয়ে বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ কোটা বরাদ্দ দেওয়া। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ স্থায়ীকরণ, উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও আধুনিক সুরক্ষাসামগ্রী প্রদান করা। কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্যান্য পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং জাতভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা।

নিজের রক্ত-ঘাম পানি করে যারা প্রতি সকালে আমাদের একটি সতেজ ও পরিচ্ছন্ন শহর উপহার দেন, প্রতিদানে আমরা তাদের দিচ্ছি অবহেলা আর ঘৃণা। হরিজন সম্প্রদায় কোনো করুণা বা দয়া চায় না; তারা চায় শুধুই সহমর্মিতা এবং একজন নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com