নতুন গ্রাম থেকে নওগাঁ: এক ঐতিহাসিক জনপদের গল্প

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

বিস্তীর্ণ সবুজ ধানের মাঠ, বরেন্দ্র ভূমির রুক্ষ প্রকৃতি, নদীবিধৌত জনপদ আর হাজার বছরের ইতিহাস—সব মিলিয়ে নওগাঁ যেন বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত অধ্যায়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী এই জেলা কৃষির জন্য যেমন সুপরিচিত, তেমনি প্রাচীন সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জমিদারি ঐতিহ্যের জন্যও সমানভাবে সমৃদ্ধ।

প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ হিসেবে নওগাঁর ইতিহাসের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। সময়ের পরিক্রমায় রাজবংশের উত্থান-পতন, ধর্ম ও জ্ঞানচর্চার বিস্তার, জমিদারি শাসন, ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জেলা গঠন—সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এই জনপদ।

 

নতুন গ্রাম’ থেকে নওগাঁ:

 

নওগাঁ নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে ঐতিহাসিক কৌতূহল। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ফারসি ‘নও’ অর্থ নতুন এবং বাংলা ‘গাঁ’ অর্থ গ্রাম—এই দুই শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে ‘নওগাঁ’ নামটি। অর্থাৎ, নওগাঁ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘নতুন গ্রাম’।

আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা নতুন জনবসতিকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে এই নামের প্রচলন ঘটে বলে ধারণা করা হয়। সেই ছোট্ট জনপদই সময়ের প্রবাহে বিস্তৃত হয়ে প্রথমে প্রশাসনিক কেন্দ্র, পরে মহকুমা এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপ নেয়।

 

পাহাড়পুর হয়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চার স্থান:

 

নওগাঁর ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি জড়িয়ে আছে পাল রাজবংশের সঙ্গে। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় পাল শাসনামলে শিক্ষা, ধর্ম, শিল্প ও স্থাপত্যের যে বিকাশ ঘটেছিল, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বর্তমান বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার।

পাল সম্রাট ধর্মপালের শাসনামলে নির্মিত এই মহাবিহার একসময় শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান ছিল না; এটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম, দর্শন, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসুরা এখানে আসতেন শিক্ষা ও সাধনার জন্য।

কালের বিবর্তনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও সোমপুর মহাবিহার আজও বহন করছে প্রাচীন বাংলার জ্ঞান, স্থাপত্য ও সভ্যতার গৌরব। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে নওগাঁর এই ঐতিহাসিক নিদর্শন বিশ্বদরবারে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

 

আজও রাজা-জমিদারদের স্মৃতি বহন করছে প্রাচীন প্রাসাদ গুলো:

 

কৃষি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে নওগাঁ অঞ্চলে একসময় শক্তিশালী জমিদারি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সেই সময়ের ক্ষমতা, আভিজাত্য ও স্থাপত্যশৈলীর স্মৃতি আজও বহন করছে জেলার বিভিন্ন রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়ি।

নওগাঁ সদর উপজেলার দুবলহাটি রাজবাড়ি জেলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা। একসময় এই রাজবাড়িকে ঘিরেই পরিচালিত হতো বিস্তীর্ণ এলাকার প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড।

অন্যদিকে বলিহার রাজবাড়ি আজও স্মরণ করিয়ে দেয় জমিদারি যুগের রাজকীয় ঐতিহ্য। সময়ের আঘাতে এসব স্থাপনার অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের দেয়াল, ধ্বংসাবশেষ ও স্থাপত্যে এখনও লুকিয়ে আছে বহু অজানা ইতিহাস।

 

মহকুমা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা:

 

ব্রিটিশ শাসনামলে নদীপথনির্ভর যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নওগাঁর গুরুত্ব বাড়তে থাকে। আত্রাই ও ছোট যমুনাসহ বিভিন্ন নদীপথ এই অঞ্চলের কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ১৮৭৭ সালে নওগাঁ মহকুমা গঠিত হয়। দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সালে নওগাঁ পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা লাভ করে। বর্তমানে ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও ঐতিহাসিক জেলা।

 

ধানের গোলার আড়ালে ইতিহাসের বিশাল ভাণ্ডার:

 

নওগাঁকে অনেকেই চেনেন ‘ধানের জেলা’ হিসেবে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধানের আবাদ এবং দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে এই পরিচিতি দীর্ঘদিনের। তবে ধানের সবুজ মাঠের আড়ালে নওগাঁ ধারণ করে আছে হাজার বছরের সভ্যতা ও ইতিহাসের এক বিশাল ভাণ্ডার।

সোমপুর মহাবিহারের বিশ্ব ঐতিহ্য, দুবলহাটি ও বলিহার রাজবাড়ির জমিদারি স্মৃতি এবং বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা—সব মিলিয়ে নওগাঁ বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রে এক অনন্য জনপদ।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এসব নিদর্শনের যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নওগাঁ হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র।

 

ধানের শীষে দোলা দেওয়া বাতাসের সঙ্গে এখানে মিশে আছে বহু শতাব্দীর গল্প। প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে রাজপ্রাসাদের নীরব দেয়াল—সবকিছুই যেন বলে যায় একটি জনপদের দীর্ঘ পথচলার কথা। সেই জনপদের নাম-ই হলো নওগাঁ।

 

___মোঃ রমজান হোসেন লেখক ও গণমাধ্যম কর্মী।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com