গত ৪০ বছর ধরে তথ্য আমাদের একই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে। এখন প্রশ্ন একটাই—ক্ষমতার আসনে যারা আছেন, তারা কি সেই সতর্কবার্তা শুনছেন?

পূর্বানুমানযোগ্য বন্যা, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা অপ্রস্তুত ঢাকা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম

“সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বড় বড় বন্যার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের রাজধানীর জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো বন্যা ব্যবস্থাপনা কৌশল গড়ে তুলতে পারেনি।”

ঢাকা: ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় রেকর্ড ৮৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, মাত্র এক মাসেই রাজধানীতে প্রায় ২৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনমিটার পানি নেমে এসেছিল—যা প্রায় এক লক্ষেরও বেশি অলিম্পিক মানের সুইমিং পুল পানিতে পূর্ণ করার সমান। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। সড়ক তলিয়ে যায়, অসংখ্য বাড়িঘর প্লাবিত হয়, প্রাণহানি ঘটে এবং নগরজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এই বিপর্যয়ও ঢাকার জন্য কার্যকর ও টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার কোনো বাস্তবসম্মত কৌশল গড়ে তুলতে পারেনি।

সম্প্রতি ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ বছরের মাসভিত্তিক বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা আমাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত উদাসীনতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। ঢাকার সমস্যা কোনো আকস্মিক বা ব্যতিক্রমী আবহাওয়া নয়; বরং এটি পরিসংখ্যানগতভাবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং গাণিতিকভাবে পরিমাপযোগ্য এক জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি, যার জন্য শহরটি কখনোই যথাযথভাবে পরিকল্পিত হয়নি।

এই ৪০ বছরে ৫০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে এমন ২৯টি ‘চরম বৃষ্টিপাতের মাস’ শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১৬ মাসে একবার এমন একটি বড় বৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে তীব্র ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সেপ্টেম্বর ২০০৪ (৮৩৯ মিমি), জুলাই ২০০৭ (৭৫৩ মিমি), সেপ্টেম্বর ১৯৯১ (৬৯২ মিমি) এবং সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ (৬৮৭ মিমি)। এগুলো কেবল লাখো মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের ইতিহাস নয়; নগর পরিকল্পনার ভাষায় এগুলো সেই মানদণ্ড, যার ভিত্তিতে একটি শহরের সহনশীলতা নির্ধারণ করা উচিত।

বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পাম্প স্টেশনগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ২৪ ঘণ্টা চালিয়েও প্রতিদিন প্রায় ৮৬ লাখ ঘনমিটার পানি নিষ্কাশন করতে পারে। অথচ ২০০৪ সালের মতো একটি চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনায় শহরে নেমে আসে প্রায় ২৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনমিটার পানি। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থার সক্ষমতা মোট পানির মাত্র ৩.৪ শতাংশ অপসারণ করতে পারে; বাকি ৯৬.৬ শতাংশ পানি রাস্তাঘাট, অলিগলি এবং বসতবাড়িতে জমে থাকে।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—ঢাকাকে একসময় যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা বন্যা থেকে রক্ষা করত, অর্থাৎ খাল, হাওর, বিল এবং পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক বন্যাভূমি, সেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হারিয়ে যায়নি; বরং আমাদের নিজেদের পরিকল্পনাহীন উন্নয়নই সেগুলো ধ্বংস করেছে।

১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বৃহত্তর ঢাকা মহানগরে অর্ধেকেরও বেশি জলাভূমি বিলুপ্ত হয়েছে। রিমোট সেন্সিংভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যেই জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ১৩ শতাংশ কমে গেছে। একসময় কেন্দ্রীয় ঢাকার বৃষ্টির পানি বালু নদীতে পৌঁছে দেওয়া বেগুনবাড়ী খাল আজ প্রায় কংক্রিটে আবদ্ধ একটি সংকীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে। একইভাবে, শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বন্যা প্রতিরোধক পূর্বাঞ্চলের নিম্নভূমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে পূর্বাচল ও বসুন্ধরা আবাসন প্রকল্প।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি হেক্টর জলাভূমি হারালে নগর এলাকার প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা ২,৫০০ থেকে ৬,৫০০ ঘনমিটার কমে যায়। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ঢাকা প্রায় ৫,০০০ হেক্টর কার্যকর জলাভূমি হারিয়েছে। ফলে শহরটি আনুমানিক ১২.৫ থেকে ৩২.৫ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক বন্যা ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। অর্থাৎ, যে পানি একসময় প্রকৃতি নিজেই ধারণ করতে পারত, তা আজ সরাসরি শহরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি শহর নিজেই তার প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছে।

একই ভুলের পুনরাবৃত্তিঃ

বাংলাদেশের নগর পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাস যেন একটি পূর্বপরিচিত চক্র অনুসরণ করে। প্রথমে ভয়াবহ বন্যা হয়, এরপর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আসে, উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থায়নের ঘোষণা দেয়, কিছু ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু পরবর্তী বড় বৃষ্টিতেই সেই উন্নত ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়ে, এবং একই চক্র আবার শুরু হয়।

১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু তার অল্প সময় পরই ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আবারও ৬৯২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক বন্যার পর মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা সংশোধন করা হয় এবং বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রকল্প শুরু হয়। এরপর ২০০৪ সালে ৮৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টি সেই ব্যবস্থাকেও অপ্রতুল প্রমাণ করে। পরবর্তীতে নতুন ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ২০০৭ সালে আবার ৭৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

অতীতের দুর্যোগকে ভিত্তি করে পরিকল্পনা করলে নগর পরিকল্পনা সব সময়ই এক মৌসুম পিছিয়ে থাকবে। বাস্তবতা হলো, আমরা তথ্য থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না; বরং প্রতিবারই তথ্য আমাদের বিস্মিত করছে।

ঢাকা কি ‘স্পঞ্জ সিটি’ হতে পারে?

‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা ড্রেন নির্মাণ বন্ধ করার কথা বলে না। বরং এটি মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু ড্রেন নির্মাণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃত সমাধান হলো পানি দ্রুত সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং যেখানে বৃষ্টি হয় সেখানেই যতটা সম্ভব পানি ধরে রাখা, ধীরে ধীরে তা নিষ্কাশন করা এবং এই ব্যবস্থাকে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনার সঙ্গে একীভূত করা।

ঢাকার জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে—

1. বাধ্যতামূলক অন-সাইট পানি ধারণ ব্যবস্থা: এক হাজার বর্গমিটারের বেশি অপ্রবেশ্য (Impervious) পৃষ্ঠবিশিষ্ট নতুন সব উন্নয়ন প্রকল্পে প্রথম ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি নিজস্ব ব্যবস্থায় সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ জন্য গ্রিন রুফ, বায়োরিটেনশন সেল, পারমিয়েবল পেভমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ রেইনওয়াটার সিস্টার্ন ব্যবহার করা যেতে পারে।

2. খাল পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: নতুন কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণের তুলনায় একটি কার্যকর খাল পুনরুদ্ধার অনেক বেশি ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নগরের তাপমাত্রা হ্রাস ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু বেগুনবাড়ী খাল পুনরুদ্ধার করলেও কেন্দ্রীয় ঢাকার পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

3. অবশিষ্ট জলাভূমির আইনি সুরক্ষা: ডেমরা–নরসিংদী সড়কের পূর্বাঞ্চলে যে জলাভূমিগুলো এখনও টিকে আছে, সেগুলোকে স্থায়ীভাবে পরিবেশগত সংরক্ষিত অঞ্চল (Ecological Reserve) ঘোষণা করতে হবে এবং ওই এলাকায় চলমান সব উন্নয়ন অনুমোদন বাতিল করতে হবে।

4. ছোট আকারের রিটেনশন বেসিন নির্মাণ: শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অর্ধ হেক্টর থেকে দুই হেক্টর আয়তনের প্রায় ২০০ থেকে ৪০০টি পানি ধারণ বেসিন নির্মাণ করে সেগুলোকে খাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

5. বাজেট পুনর্বিন্যাস: আগামী ১০ বছরে পানি ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দের বর্তমান ৮৫–৯০ শতাংশ গ্রে ইনফ্রাস্ট্রাকচার নির্ভরতা কমিয়ে গ্রে ও ব্লু-গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য আনতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান পাইপলাইন ও পাম্পিং ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও অব্যাহত রাখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো—ঢাকা কি জলাভূমি ও খাল সংরক্ষণে বিনিয়োগ করতে পারবে কি না, সেটি নয়; বরং আরেকটি ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর বা ২০০৭ সালের জুলাইয়ের মতো বিপর্যয়ের মূল্য পরিশোধ করার সামর্থ্য আদৌ ঢাকার আছে কি না।

সবশেষ চরম বৃষ্টিপাতের মাস ছিল আগস্ট ২০২৪। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রতি ১৬ মাসে এমন একটি ঘটনা ফিরে আসে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছে। ২০২৬ সালের বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যদি আবার একটি চরম বৃষ্টিপাতের মাস আসে, তাহলে ঢাকা এখনও তার জন্য প্রস্তুত নয়।

গত ৪০ বছর ধরে তথ্য আমাদের একই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে। এখন প্রশ্ন একটাই—ক্ষমতার আসনে যারা আছেন, তারা কি সেই সতর্কবার্তা শুনছেন?

 

লেখক: মাসুদুর রশীদ, নগর পরিকল্পনাবিদ

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com