মূলহোতার ১০ বছর, সাক্ষীর ৭ বছর, পাঁচজনের ৫ বছর করে সা/জা

আলফাডাঙ্গায় সরকারি জমি জালিয়াতি: ৭ জনের কা/রা/দ/ণ্ড

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:১১ পিএম

মো. মামুন অর রশিদ, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) :

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সরকারি অর্পিত জমি জাল দলিলের মাধ্যমে আত্মসাতের চেষ্টার ঘটনায় দীর্ঘ প্রায় এক দশকের আইনি লড়াই শেষে জালিয়াতি চক্রের সাত সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে চক্রের মূলহোতা আকবর মোল্লাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই মামলায় দলিলের এক সাক্ষীকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং অপর পাঁচজনকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় একজন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. রকিবুল ইসলাম বিশ্বাস বৃহস্পতিবার রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মামলার নথি, পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত এ রায় দেন। তার ভাষ্য, সরকারি সম্পত্তি জালিয়াতি ও অসহায় মানুষের জমি দখলচেষ্টার বিরুদ্ধে এ রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, আলফাডাঙ্গা উপজেলার বানা ইউনিয়নের পণ্ডিতবানা গ্রামের মৃত গণেশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী লক্ষী রানী দাস দীর্ঘদিন ধরে পাঁচুড়িয়া মৌজার এসএ ২৭৬ নম্বরের ১৭১ শতাংশ সরকারি অর্পিত জমি বৈধভাবে ইজারা নিয়ে নিয়মিত লিজ মানি ও খাজনা পরিশোধ করে আসছিলেন। ওই জমিই ছিল তার এবং তার শারীরিক প্রতিবন্ধী একমাত্র সন্তানের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

অভিযোগে বলা হয়, কোটি টাকা মূল্যের ওই জমি দখলের উদ্দেশ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী আকবর মোল্লার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভূমি অফিসের খাজনা দাখিলা জাল করে। ১৯৭১ সালে প্রকৃত মালিকদের দেশত্যাগের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে তাদের নামে ভুয়া দাতা ও মিথ্যা সাক্ষী দাঁড় করিয়ে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি ভুয়া সাব-কবলা দলিল সম্পাদন করা হয়।

ঘটনা প্রকাশ্যে এলে পাঁচুড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তৎকালীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. জহুরুল হক বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তে পিবিআই নিশ্চিত হয়, দলিলে উল্লেখিত দাতা বিদ্যুৎ বিশ্বাস ও অশোক বিশ্বাস বহু আগেই ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং দলিল সম্পাদনের সময় তারা বাংলাদেশে উপস্থিত ছিলেন না। তাদের নামে ব্যবহৃত স্বাক্ষর, টিপসই এবং ভূমি অফিসের খাজনা দাখিলা সম্পূর্ণ জাল বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট মোট আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আকবর মোল্লাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা, দলিলের সাক্ষী হুমায়ুন মোল্লাকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং শাহজাহান মোল্লা, আব্দুল মান্নান মোল্লা, আলী হায়দার, গোলাপ খান ও নুরুল ইসলামকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ইয়াকুব মোল্লাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

রায় ঘোষণার সময় পলাতক নুরুল ইসলাম ছাড়া অন্য ছয় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে আদালতের নির্দেশে দণ্ডপ্রাপ্তদের ফরিদপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় লক্ষী রানী দাস বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে তিনি চরম কষ্টে জীবনযাপন করেছেন। সরকারের দেওয়া ইজারার জমিটিই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল। জাল কাগজপত্র তৈরি করে প্রভাবশালীরা সেই জমি দখলের চেষ্টা চালায় এবং একপর্যায়ে তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আদালতের রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তিনি আদালত, তদন্ত সংস্থা এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ রায় ভূমি জালিয়াতি, জাল দলিল তৈরি ও সরকারি সম্পত্তি দখলচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com