রাজবাড়ী
ইতিহাসের এক নিরব সাক্ষী নওগাঁর বলিহারের রাজবাড়ী
নওগাঁ জেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পশ্চিমে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক বলিহার রাজবাড়ি। একসময় যে প্রাসাদ ছিল জমিদারি শাসন, ঐশ্বর্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই আজ নীরব ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং পরবর্তী সময়ের লুটপাট ও অবহেলায় হারিয়ে গেছে এর বহু মূল্যবান নিদর্শন। ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে নৃসিংহ চক্রবর্তী নামের এক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি এ অঞ্চলের বিশাল এলাকার জায়গির লাভ করেন। তাঁর উত্তরসূরিদের হাত ধরেই কালক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় বলিহার জমিদার বংশ। বলিহারের জমিদাররা শাসনকার্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ বংশের রাজা কৃষ্ণেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর ছিলেন একজন খ্যাতনামা লেখক। তাঁর ‘কৃষ্ণেন্দ্র গ্রন্থাবলী’ তৎকালীন সুধীসমাজে সমাদৃত হয়েছিল। লোকমুখে প্রচলিত আছে, বার ভূঁইয়াদের দমনে মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ এ অঞ্চলে যাত্রাবিরতি করেছিলেন। সে সময় সৈন্যদের অলসতা দূর করতে ৩৩০টি দীঘি ও পুকুর খনন করানো হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বলিহার রাজপরিবারের ভাগ্যেও বড় পরিবর্তন আসে। দেশভাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার মধ্যে বলিহারের শেষ রাজা বিমলেন্দু রায় সপরিবারে ভারতে চলে যান। এরপর ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে বলিহার জমিদারির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা জমিদারি শাসনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। রাজপরিবার দেশ ছাড়ার পর বিশাল প্রাসাদের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে কর্মচারীদের ওপর। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দফায় রাজবাড়ির মূল্যবান আসবাবপত্র, কড়িকাঠ, দরজা-জানালা ও বহু প্রাচীন নিদর্শন লুট হয়ে যায়। ১৮২৩ সালে নির্মিত বিখ্যাত ‘রাজ-রাজেশ্বরী দেবীর মন্দির’ থেকেও ঐতিহাসিক পিতলের মূর্তি চুরি হয়ে যায় বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন অবহেলা ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর ২০২২ সালে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেটের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বলিহার রাজবাড়িকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণ, সংস্কার এবং এর আদি রূপ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখানকার দেবালয়ে নিয়মিত পূজা-অর্চনা চালিয়ে যাচ্ছেন।