বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণঃ এখন সময়ের দাবি

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে সর্বমোট ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) রয়েছে। স্তরভিত্তিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুমানিক সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো: 

মাধ্যমিক বিদ্যালয় (হাই স্কুল): সারা দেশে প্রায় ১৯,৭৫৭টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ (উভয় স্তর): প্রায় ১,৩৮২টি। উচ্চমাধ্যমিক কলেজ: ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ২,৬৬৪টি। মাদ্রাসা: প্রায় ৯,২৬৫টি। 

কারিগরি ও ভোকেশনাল: প্রায় ২,২২৫টি। 

 শিক্ষাখাতের সঠিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও সামগ্রিক ডাটাবেজ তৈরি করতে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ ও নিবন্ধন হালনাগাদ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার)। ব্যানবেইসের (BANBEIS) বাৎসরিক প্রতিবেদনে এসব বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক কে? এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) শিক্ষক যারা সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন-ভাতা পান। “এমপিও” (MPO) এর পূর্ণরূপ হলো “মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার” (Monthly Payment Order), যা দ্বারা এই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান।

বাংলাদেশে শিক্ষার ৯৩ শতাংশই বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে।

এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে,দীর্ঘমাসাধিককাল সময় ধরে 

ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মানুষের কাতারেই পড়েন না! তাদের দাবিদাওয়া বলতে কিছুই নেই বা থাকতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা বলতেই বুঝায় বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা। সরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। 

অন্যদিকে, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান।

স্বল্প বেতনে বাড়ি হতে অনেক দূরে গিয়ে তাদের চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকা এমন মানুষদের চাকরি এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরপুর। তাই এমপিও সিস্টেম রাখাটা কতোটুকু যুক্তিসংগত তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একটি হিসেবে দেখা যায়- যদি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নেয় তাহলে সরকারের লাভ বেশী হতো। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন স্কেলের শতভাগ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এছাড়াও আছে বাড়ি ভাড়া আর সামান্য মেডিক্যাল ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা।

আমরা বেসরকারি শিক্ষকগণ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পর জাতীয়করণের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিশৃঙ্খলার বদনামতো আছেই। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যত্রতত্র অর্থ আদায়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি ব্যবসায়িক পণ্য পরিণত হয়েছে।

জাতীয়করণ হলে শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগর শিক্ষকগণ লাভবান হবে না শুধু জাতিও লাভবান হবে। তারা তাদের দোরগোড়ায় পছন্দের সরকারি স্কুল-কলেজ পাবে সাথে তাদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে। ছাত্রছাত্রীদের হতে আদায়কৃত অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রিয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিলে এটাই হবে জাতীয়করণের  সহজ সরল কাজ।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই অ্যাকাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে এক বড় ধরনের বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেলের একধাপ নিচে দেওয়া হয়। তাছাড়া উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারি প্রধানদের বেতন স্কেল সমান হওয়ায় সহকারি প্রধান মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা এখনো সরকারি অনুদান থেকে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের বেতন ভাতা কখন ছাড় হবে তা জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বেতনের খবর এক তারিখের মধ্যে প্রচারিত হলেও ব্যাংকে জমা হতে মাসের ১০/১২ তারিখ চলে যায়। তারপরে পরিচালনা পর্ষদ সভাপতির দস্তখতসহ বেতন বিল তৈরি করে ব্যাংকে জমা দিতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যায়। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের পকেটে বেতনের টাকা আসতে মাসের বিশ তারিখ হয়ে যায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগরদের বেতন এখনো অনুদান সহায়তা- এটা তাদের জীবনে এক ধরনের ‘চলিতেছে সার্কাসে’র মতো। বেসরকারি শিক্ষকরা এমনিতেই এমপিও সিস্টেমের জটিল নিয়মের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন শিক্ষক ইচ্ছা মতো তাদের পছন্দের বাড়ির কাছের প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে পারছেন না। 

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী টাকা পাওয়ার আগেই অর্থাভাবে বিনাচিকৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে কোনও ধরনের সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কাটা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক।

 ১৯৭৩ সালে একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমকি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। ১৯১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় । এ অবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে দ্রুত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বিনিয়োগে ইউনেস্কো আইএলও’র সুপারিশগুলো বাস্তবায়নসহ সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা জাতীয়করণ প্রয়োজন।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পাঠ্যক্রম, আইন এবং একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বেতনের ১০ হারে কেটে রাখলেও বৃদ্ধ বয়সে যথাসময়ে এ টাকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা:

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন,আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশ নেত্রী, আপোষহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ওয়াদা করেছিলেন ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যার ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ওয়াদা করেছিলেন বি এন পি রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেলে প্রথম কাজ হবে দেশের এম পি ও ভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জীবন মানের উন্নয়ন করার জন্য চাকরি জাতীয়করণ করা হলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সমস্যাটি মানবিক কারণে সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করুন। আপনার মানবিক দয়ালু  হস্তক্ষেপেই পাঁচ লাখ জীবন স্বাচ্ছন্দময় হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষকদের শ্রম ও মেধার মূল্যায়ন করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক 

আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ। 

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com