আদ্ দ্বীনের দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা: এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১১:৩০ এএম
আদ্ দ্বীনের দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা: এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত
একরামুল ইসলাম তুষার, (সহকারী অধ্যাপক) কলাম লেখক।
রাজধানীর আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ জনেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী (অধিকাংশই ভারতীয়) অধ্যয়নরত আছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ইন্টার্ন শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ৩শ'রও বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিলের মতো জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও ইন্টার্নশিপ মারাত্মকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং মানবসেবার ব্রত নিয়ে সুদূর ভারত ও মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে পড়তে এসেছিলেন তারা। বাবা-মায়ের রক্তঘাম করা উপার্জনে কেনা স্বপ্ন আজ মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বন্ধ লাইসেন্সের বেড়াজালে বন্দি। দীর্ঘ ১১ দিন ধরে বন্ধ একাডেমিক কার্যক্রম। দেশের মাটিতে ডাক্তারি করার স্বপ্ন নিয়ে আসা এই তরুণ প্রাণগুলো এখন শুধুই এক বুক হতাশা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে রাজধানীর রাজপথে ঘুরছে।
কর্তৃপক্ষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও মিলছে না একটু আশ্বাস, মিলছে না কোনো দেখা। নিয়তির নির্মম পরিহাসে আজ তাদের শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে।
দুয়ারে দুয়ারে কড়া নাড়া, কিন্তু কোথাও মেলেনি সাড়া
গত সোমবার ও মঙ্গলবার ছিল এই শিক্ষার্থীদের জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার দুটি দিন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) তপ্ত রোদে সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৩২ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে ছিল কেবলই আকুতি। তারা এসেছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সচিব মহোদয় দপ্তরে ছিলেন না। খালি হাতে, ভাঙা মন নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাদের।
এর আগের দিন সোমবারও তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কার্যালয়ে। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে তারা ছুটে যান স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে। কিন্তু সেখানকার মহাপরিচালকও কার্যালয়ে ছিলেন না। রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটুখানি সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য এই ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের এমন হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো যেন পুরো ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
"বিদেশ থেকে এই দেশে পড়তে এসেছি, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে। আজ আমরা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। আমরা কোনো সমস্যা নিয়ে দেশে ফিরতে চাই না, আমরা আমাদের পড়াশোনার সুষ্ঠু সমাধান চাই।"
আইনের বেড়াজাল ও এক অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর হয়তো অন্য হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের সংযুক্তির নির্দেশ দিয়ে সাময়িক সমাধানের পথ খুঁজেছে, কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল। ভারতের 'ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন (ফরেন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট লাইসেন্সিয়েট) রেগুলেশন্স, ২০২১'-এর ৪(ক) (২) ধারা অনুযায়ী— যে মেডিকেল কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থী এমবিবিএস পাস করবেন, ঠিক সেই একই প্রতিষ্ঠানের হাসপাতাল থেকেই তাকে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় নিজ দেশে গিয়ে তারা আর ডাক্তারি করার লাইসেন্স পাবেন না।
ফলে, অন্য কোনো হাসপাতালে স্থানান্তর মানেই তাদের এত বছরের পড়াশোনা, লাখ লাখ টাকা খরচ এবং চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনে যোগাযোগ করেও এখনো কোনো আশাব্যজক সাড়া পাননি তারা।
সাড়ে তিনশো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কি শুধুই অন্ধকার?
বর্তমানে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১ জন ভারতীয় এবং ১ জন মালদ্বীপের শিক্ষার্থীসহ সাড়ে তিনশরও বেশি শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ করছেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কোনো ভুলের বা আইনি জটিলতার দায় কেন এই নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের কাঁধে এসে পড়বে? কেন তাদের স্বপ্নগুলো এভাবে মাঝপথে থমকে যাবে?
এত কিছুর পরও বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখনো আশাবাদী। তারা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের এই মানবিক সংকটটি অনুধাবন করবে।
কর্তৃপক্ষের প্রতি আকুল আবেদন
এটি কেবল একটি হাসপাতালের লাইসেন্স বন্ধের বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ভাবমূর্তি এবং শত শত শিক্ষার্থীর জীবনের প্রশ্ন। অনতিবিলম্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই মানবিক সংকটে এগিয়ে আসতে হবে। একটি বিশেষ বিবেচনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও একাডেমিক কার্যক্রমের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ভুল কর্তৃপক্ষের হতে পারে, কিন্তু তার শাস্তি যেন এই স্বপ্নচারী শিক্ষার্থীদের পেতে না হয়। সংশ্লিষ্ট মহল কি এই তরুণদের চোখের জল আর আকুতি প্রতি দৃষ্টি দিবেন এটাই একমাত্র ভরসা।
লেখক: একরামুল ইসলাম তুষার, (সহকারী অধ্যাপক)।
আরও পড়ুন
নওগাঁয় গরুবোঝাই ভুটভুটি পুকুরে উল্টে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর, আহত ৫ জন
চা চাষিদের ভর্তুকির সার বরাদ্দ নিশ্চিতের আশ্বাস, চায়ের চোরাচালান রোধে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
চরভদ্রাসনে ভুবনেশ্বর খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারীর নাম শ্রমিকের তালিকায়